Bangla Panjika 2026

কৃষ্ণকুমার কুন্নথ: ভারতীয় সঙ্গীত জগতের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী

ভারতীয় নেপথ্য সঙ্গীতের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় এক নাম (২৩ আগস্ট ১৯৬৮ — ৩১ মে ২০২২) কৃষ্ণকুমার কুন্নথ, যিনি সারা বিশ্বের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় কেকে (KK) নামে সমধিক পরিচিত। তিনি হিন্দি, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, মারাঠি, ওড়িয়া, বাংলা ও গুজরাটি চলচ্চিত্রে অসংখ্য কালজয়ী গান গেয়েছেন। অনন্য কণ্ঠশৈলী এবং আবেগময় গায়কির কারণে তাঁকে ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গায়কদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রারম্ভিক জীবন

কৃষ্ণকুমার কুন্নথ ১৯৬৮ সালের ২৩শে আগস্ট নতুন দিল্লিতে এক হিন্দু মালয়ালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতামাতা হলেন সি. এস. মেনন এবং কুন্নথ কনকবল্লি। দিল্লির মাউন্ট সেন্ট ম্যারিস স্কুল থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কিরোরি মাল কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

১৯৯১ সালে কেকে তাঁর শৈশবের ভালোবাসা জ্যোতিকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে নকুল কৃষ্ণ কুন্নথ নামে এক পুত্র এবং এক কন্যা সন্তান রয়েছে। পুত্র নকুল তাঁর বাবার সঙ্গে ‘হামসফর’ অ্যালবামের “মাস্তি” গানে দ্বৈত কণ্ঠ দিয়েছেন। ১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারত ক্রিকেট দলের সমর্থনে গাওয়া “জোশ অব ইন্ডিয়া” গানে কণ্ঠ দিয়েও কেকে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

সঙ্গীতের ধরন ও অনুপ্রেরণা ⚡

কেকে কোনোদিন সঙ্গীতের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম গ্রহণ করেননি। সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও চর্চায় তিনি ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নিজের স্থান তৈরি করেছিলেন। তিনি কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী কিশোর কুমার এবং প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণের (আর. ডি. বর্মণ) দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মাইকেল জ্যাকসন, বিলি জোয়েল ও ব্রায়ান অ্যাডামস ছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পী।

কর্মজীবনের শুরু ও জিঙ্গেল জগত

স্নাতক শেষ করার পর কেকে প্রায় আট মাস একটি হোটেলের বিপণন নির্বাহী হিসেবে কাজ করেন। তবে সঙ্গীতের টানে ১৯৯৪ সালে তিনি মুম্বইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে লুইস ব্যাংকস, রঞ্জিত বরোত ও লেসলি লুইসকে নিজের ডেমো টেপ দেন। ইউটিভি থেকে প্রথম সুযোগ পেয়ে তিনি একটি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দেন। এরপর মাত্র চার বছরে তিনি ১১টি ভাষায় প্রায় ৩,৫০০টি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেন।

কিংবদন্তি সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমানের সুরে তামিল চলচ্চিত্র ‘কাদল দেসম’ (১৯৯৬)-এর “কাল্লুরি সালে” ও “হ্যালো ডক্টরস” এবং ‘মিনসর কনবু’ (১৯৯৭)-এর “স্ট্রবেরি কান্নে” গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর মূল কর্মজীবন শুরু হয়।

বলিউডে অভিষেক ও তুমুল জনপ্রিয়তা

১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ চলচ্চিত্রের “তড়প তড়প কে ইস দিল সে” গানটি ছিল কেকে-র বলিউডের মূল অভিষেক এবং এটি তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বাঁকবদল হিসেবে প্রমাণিত হয়। এর আগে তিনি গুলজারের ‘মাচিস’ (১৯৯৬) চলচ্চিত্রের “ছোড় আয়ে হাম” গানের কিছু অংশে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে তিনি একের পর এক ব্লকবাস্টার গান উপহার দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। তাঁর গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু গান নিচে দেওয়া হলো—

  • তড়প তড়প কে (১৯৯৯)
  • বরদস্ত নহিঁ কর সকতা (২০০২)
  • তু আশিকি হ্যায় (২০০৩)
  • আওয়ারাপন বানজারাপন (২০০৩)
  • ইট্‌স দ্য টাইম টু ডিস্কো (২০০৩)
  • দস বাহানে (২০০৫)
  • তুহি মেরি সব হ্যায় (২০০৬)
  • আঁখোঁ মে তেরি (২০০৭)
  • লাবোঁ কো (২০০৭)
  • জারা সা (২০০৮)
  • खोদা জানে (২০০৮)
  • জিন্দগি দো পাল কি (২০১০)

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

সঙ্গীত জগতে অসামান্য অবদানের জন্য কেকে অসংখ্য পুরস্কার ও মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মোট ৬ বার মনোনয়ন লাভ করেন। ২০০৮ সালে ‘বাচনা অ্যায় হাসিনো’ চলচ্চিত্রের “খোদা জানে” গানের জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ স্ক্রিন পুরস্কার অর্জন করেন।

দক্ষিণী চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ২০০৫ সালে তামিল চলচ্চিত্রে গাওয়ার জন্য তিনি ‘হাব পুরস্কার’, ২০১০ সালে কন্নড় চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দক্ষিণ’ এবং ২০১২ সালে মালয়ালম সঙ্গীতের জন্য ‘ঈনম-স্বরালয় বর্ষসেরা গায়ক পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।

আকস্মিক প্রস্থান

৩১ মে ২০২২ তারিখে কলকাতার নজরুল মঞ্চে একটি লাইভ কনসার্টে পারফর্ম করার সময় কেকে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন। অনুষ্ঠান শেষ করে এসপ্ল্যানেডের হোটেলে ফেরার পর তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর এই আকস্মিক বিদায় ভারতীয় সঙ্গীত জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি সৃষ্টি করেছে, তবে তাঁর অমর গানগুলোর মাধ্যমে তিনি কোটি ভক্তের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

home3