
স্যার রাসবিহারী ঘোষ (২৩ ডিসেম্বর ১৮৪৫ – ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২১) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সমাজকর্মী ও মহান লোকহিতৈষী। ঔপনিবেশিক ভারতের রাজনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান গভীরভাবে স্মরণীয়। সমাজকল্যাণ, শিক্ষা বিস্তার এবং জাতীয় চেতনাকে দৃঢ় করার কাজে তিনি আজীবন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
প্রাথমিক জীবন
রাসবিহারী ঘোষের জন্ম হয়েছিল বাংলার পূর্ব বর্ধমান জেলার খণ্ডঘোষ অঞ্চলের খণ্ডঘোষ গ্রামে। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বাঁকুড়া জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স উত্তীর্ণ হওয়ার পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ইংরেজি ভাষায় কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে তিনি শিক্ষাজগতে বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেন। পরবর্তীতে আইনশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা নিয়ে অধ্যাপনা ও আইনচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ল’স ডিগ্রিতে সম্মানিত হন।
রাজনৈতিক জীবন
রাসবিহারী ঘোষ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তিনি অগ্রগতিতে বিশ্বাসী হলেও উগ্র মতাদর্শের বিরোধিতা করতেন। কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ মেলে, যখন তিনি সুরাট ও মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে একাধিক সময়ে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভারতীয় কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন রাজকীয় সম্মানে ভূষিত হন এবং নাইট উপাধিতে সম্মানিত হন।
অবদান
আইনশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে রাসবিহারী ঘোষের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাকুর আইন অধ্যাপক হিসেবে তিনি মর্টগেজ আইন বিষয়ে যে বক্তৃতামালা প্রদান করেন, তা পরবর্তীকালে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ওকালতি জীবনে অর্জিত অর্থের বৃহৎ অংশ সমাজ ও শিক্ষার কল্যাণে ব্যয় করেন। তিনি তোড়কোনায় জগবন্ধু স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য তিনি বিপুল অর্থ দান করেন। যাদবপুরে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ১৩ লক্ষ টাকা দান করেন, যার ফলেই পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও নিজ গ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলে স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
সম্মাননা ও স্মৃতি
ভারতীয় সমাজ ও জাতীয় জীবনে স্যার রাসবিহারী ঘোষের অবদানকে স্মরণ করে কলকাতা শহরে তাঁর নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। রাসবিহারী এভিনিউ কালীঘাট এলাকা থেকে শুরু করে বালিগঞ্জ ও গড়িয়াহাট পর্যন্ত বিস্তৃত, যা আজও তাঁর স্মৃতিকে বহন করে চলেছে।
