
বাপ্পী লাহিড়ী (২৭ নভেম্বর ১৯৫২ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) ছিলেন হিন্দি ও বাংলা—দুই ভাষার সংগীত গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করা এক বিশেষ নাম। সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে তিনি বাপ্পী-দা নামে পরিচিত। নিজের সুর করা অসংখ্য গান তিনি স্বকণ্ঠেও গেয়েছেন এবং বিশেষ করে ১৯৮০-র দশকে ভারতীয় ডিস্কো সঙ্গীতে নতুন ধারা এনে দর্শক-শ্রোতাদের মন জয় করেন।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
বাপ্পী লাহিড়ীর শৈশব কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে নিবেদিত এক পরিবারে। বাবা অপরেশ লাহিড়ী বাংলা গানের পরিচিত গায়ক এবং মা বাঁশরী লাহিড়ী ছিলেন শাস্ত্রীয় ঘরানার ও শ্যামা সঙ্গীতের গুণী শিল্পী। পরিবারে একমাত্র সন্তান বাপ্পী অতি অল্প বয়স থেকেই সঙ্গীতচর্চার পরিবেশে বড় হন।
মাত্র তিন বছর বয়সে **তবলা শেখা** শুরু করেন। সঙ্গীতের হাতেখড়ি এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ মেলে বাবা-মায়ের কাছ থেকেই। তাঁর আত্মীয়দের মধ্যে ছিলেন কিংবদন্তী কিশোর কুমার ও এস. মুখার্জী—যাঁদের উপস্থিতি তাঁর ভবিষ্যৎ সঙ্গীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তরুণ বয়সেই তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম কাজের সুযোগ পান।
ব্যক্তিগত জীবন
বাপ্পী লাহিড়ী সংসারী ও পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্ত্রী চিত্রাণী, কন্যা রিমা এবং পুত্র বাপ্পা—এই তিনজনকে কেন্দ্র করেই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জগৎ। **অলঙ্কারের প্রতি তাঁর অনুরাগ** ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়; প্রায়শই স্বর্ণের অলঙ্কার ও কালো চশমা পরিহিত অবস্থায় তাঁকে দেখা যেত।
পৈতৃক শিকড় ✨
তাঁর পৈতৃক শিকড় রয়েছে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার মোহনপুরে। পরিবারের অতীত, দেশভাগ এবং পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে স্থায়ী হওয়া—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনে দুটি বাংলারই একটি অদৃশ্য বন্ধন ছিল।
সঙ্গীতজীবন: ডিস্কো যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র
তরুণ বয়সেই তিনি মুম্বইয়ের পথে পা বাড়ান এবং খুব দ্রুত বলিউডে নিজের জায়গা করে নেন। হিন্দি চলচ্চিত্র ‘নানহা শিকারী’ দিয়ে তাঁর সুরসৃষ্টি শুরু হলেও জনপ্রিয়তা আসে ‘জখমী’, ‘চলতে চলতে’ এবং বিশেষ করে সুরক্ষা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।
ডিস্কো সঙ্গীতে তাঁর বিপ্লবী অবদানই তাঁকে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি এনে দেয়। মিঠুন চক্রবর্তীর নাচের চলচ্চিত্রগুলো—ডিস্কো ড্যান্সার, ড্যান্স ড্যান্স—তাঁর সুরে পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই সময়েই তিনি ডিস্কো কিং নামে সর্বভারতীয় পরিচিতি পান।
হিন্দি চলচ্চিত্র ছাড়াও বাংলা ও দক্ষিণ ভারতীয় বহু ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেন। তাঁর সুরে গান গেয়েছেন কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে, শ্যারন প্রভাকর, বিজয় বেনেডিক্টসহ বহু খ্যাতনামা শিল্পী। আলিশা চিনয় এবং ঊষা উথুপের সঙ্গেও তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে।
সুর, গান ও নেপথ্য কণ্ঠ 🎧
বহু জনপ্রিয় গানের নেপথ্যে রয়েছে বাপ্পী লাহিড়ীর জাদুকরী কণ্ঠ। তাঁর গাওয়া কিছু গান যেমন— “ইয়াদ আ রাহা হ্যায়”, “বম্বাই সে আয়া মেরা দোস্ত”, “দিল মে হো তুম”, “জে লা লা”—আজও শ্রোতাদের মনে সমানভাবে জায়গা করে আছে।
শুধু ডিস্কো নয়, তিনি রোমান্টিক গান, গজল এবং হৃদয়ছোঁয়া সুরেও সমান দক্ষ ছিলেন—“কিসি নজর কো তেরা ইন্তেজার আজ ভি হ্যায়”, “আওয়াজ দি হ্যায়” তার অনন্য উদাহরণ।
