Bangla Panjika 2026

বিপ্লবী বসন্ত— ব্রিটিশ সম্রাজ্যের ভিত কাঁপানো এক বাঙালি তরুণ

১৮৯৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নদীয়া জেলার পোড়াগাছা গ্রামে বসন্ত কুমার বিশ্বাসের জন্ম। তাঁর পিতা মতিলাল বিশ্বাস। পারিবারিক পরিবেশেই তিনি দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। উল্লেখযোগ্যভাবে, নীলবিদ্রোহের কিংবদন্তি নেতা দিগম্বর বিশ্বাস ছিলেন তাঁর মেজদাদু। ছাত্রজীবনে শিক্ষক ক্ষীরোদচন্দ্র গাঙ্গুলির দেশাত্মবোধক আদর্শ তাঁর মনে বিপ্লবের বীজ বপন করে।

পরবর্তীতে ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর বিপ্লবী অমরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসু-র সঙ্গে। ১৯১১ সালে ‘বিশে দাস’ ছদ্মনাম গ্রহণ করে তিনি রাসবিহারী বসুর সঙ্গে উত্তর ভারতে যান এবং সশস্ত্র বিপ্লবের গোপন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

লর্ড হার্ডিঞ্জ হত্যা প্রচেষ্টা

রাসবিহারী বসুর তত্ত্বাবধানে বসন্ত কুমার বিশ্বাস বোমা নিক্ষেপের বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর দিল্লিতে তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ-এর শোভাযাত্রায় হামলার পরিকল্পনা করা হয়। প্রবীণ বিপ্লবী মণীন্দ্রনাথ নায়েকের তৈরি বোমা নিয়ে বসন্ত বিশ্বাস ‘লীলাবতী’ ছদ্মনামে নারীর বেশ ধারণ করে জনসমুদ্রে মিশে যান।

অসীম সাহসিকতা ও নিখুঁত কৌশলে তিনি ভাইসরয়ের উদ্দেশে বোমা নিক্ষেপ করেন। বিস্ফোরণে লর্ড হার্ডিঞ্জ গুরুতর আহত হন এবং সমগ্র ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য এক লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।

দুঃসাহসিক মানসিকতা ✨

পুরস্কার ঘোষণার পর বসন্ত বিশ্বাস ভয় না পেয়ে দিল্লির জুম্মা মসজিদ থেকে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তার জবাব পাঠান—যা তাঁর অসাধারণ আত্মবিশ্বাস ও দুঃসাহসিক মানসিকতার পরিচায়ক। পরবর্তীতে তিনি লাহোরে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ ক্লাবে বোমা হামলার পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত হন।

গ্রেপ্তার ও বিচার

১৯১৪ সালে পিতৃশ্রাদ্ধের কাজে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন বসন্ত কুমার বিশ্বাস। ২৪ ফেব্রুয়ারি কৃষ্ণনগরে বাজার করতে গিয়ে এক আত্মীয়ের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ১৯১৪ সালের মে মাসে দিল্লির দায়রা আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়। প্রথমদিকে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে তিনি মুক্তি পেলেও ব্রিটিশ সরকার সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। পরে পাঞ্জাব হাইকোর্ট তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।

আত্মবলিদান ও অমরত্ব

১৯১৫ সালের ১১ মে আম্বালা জেলে বসন্ত কুমার বিশ্বাসের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তিনি ছিলেন সেই মামলার সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী, যিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। তাঁর সঙ্গে একই দিনে ফাঁসি দেওয়া হয় মাস্টার আমীর চাঁদ, অবোধ বিহারী ও বালমুকুন্দকে। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তাঁর এই আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

স্মৃতি ও সম্মান 🏛️

  • বিপ্লবী রাসবিহারী বসু তাঁর প্রিয় শিষ্যের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে জাপানের টোকিও শহরে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছিলেন।
  • নদীয়া জেলার মুড়াগাছায় বসন্ত কুমার বিশ্বাসের স্মৃতিস্তম্ভ ও আবক্ষ মূর্তি নির্মিত হয়েছে, যার উদ্বোধন করেছিলেন বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত।
  • আজও বসন্ত কুমার বিশ্বাসের জীবন আমাদের শেখায়—দেশপ্রেম কখনও বয়স দেখে না; সাহস ও আত্মত্যাগই একজন মানুষকে ইতিহাসে অমর করে তোলে।
home3