
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (৫ মে ১৯১১ – ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২) ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী এক সাহসী বাঙালি বিপ্লবী। তিনি অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত থেকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর আত্মত্যাগের জন্য তাঁকে “বাংলার প্রথম নারী শহীদ” হিসেবে সম্মানিত করা হয়।
শৈশব ও পারিবারিক পরিচয়
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার ছিলেন পৌরসভার কর্মচারী এবং মাতা প্রতিভাদেবী। শৈশবে তিনি শান্ত, লাজুক এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। পরিবারের দায়িত্বে ছোটবেলা থেকেই তিনি মাকে বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতেন।
শিক্ষাজীবন
প্রীতিলতার শিক্ষার সূচনা হয় ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং সবসময় ভালো ফলাফল করতেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য মাইলফলকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- ১৯২৮ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন
- ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে আই.এ. পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জন করেন
- কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন
শিক্ষাজীবনে সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তাঁর মেধা এবং দেশপ্রেম তাঁকে ছাত্রজীবনেই অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
বিপ্লবী চেতনার বিকাশ ✨
ছাত্রজীবনেই দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে গভীরভাবে জন্ম নেয়। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের বীরত্বগাথা, বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড এবং নিষিদ্ধ গ্রন্থ পাঠ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। ঢাকায় অবস্থানকালে লীলা রায়ের নেতৃত্বাধীন “দীপালী সংঘ”-এ যোগ দিয়ে তিনি আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ নেন এবং ধীরে ধীরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।
সূর্য সেনের দলে যোগদান
পরবর্তীতে তিনি মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী দলে যোগ দেন। একজন নারী হয়েও তাঁর সাহস, কঠোর শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতি অদম্য আত্মনিবেদন দ্রুতই বিপ্লবী নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণের নেতৃত্ব দেন প্রীতিলতা। এই ক্লাবটি ছিল ব্রিটিশদের জন্য সংরক্ষিত এবং সেখানে বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। আক্রমণের সময় ক্লাবে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এই সশস্ত্র অভিযানে প্রীতিলতার অসাধারণ নেতৃত্বগুণ ও বীরত্ব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
অমর আত্মাহুতি
ক্লাব আক্রমণের পর ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার এড়াতে এবং বিপ্লবীদের গোপন তথ্য রক্ষা করতে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড সেবন করে আত্মাহুতি দেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
