Bangla Panjika 2026

স্যার নীলরতন সরকার — আধুনিক চিকিৎসা ও শিক্ষার এক উজ্জ্বল পথিকৃৎ

স্যার নীলরতন সরকার (১ অক্টোবর ১৮৬১ – ১৮ মে ১৯৪৩) বাংলার চিকিৎসাজগৎ, শিক্ষা আন্দোলন এবং শিল্পায়নের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে ছিলেন দূরদর্শী চিকিৎসক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক এবং সফল উদ্যোক্তা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে শুরু করে দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা জীবন

১৮৬১ সালের ১ অক্টোবর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নেতড়া গ্রামে নীলরতন সরকার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোহরে এবং বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন তাঁর ভাই। ১৮৮৮ সালে তিনি ব্রাহ্ম ধর্মপ্রচারক গিরিশচন্দ্র মজুমদারের কন্যা নির্মলা দেবীকে বিবাহ করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। জয়নগর থেকে এন্ট্রান্স এবং ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল থেকে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি মেট্রোপলিটান কলেজ থেকে এল.এ ও বি.এ পাস করেন। এরপর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৮৮৮ সালে এম.বি এবং পরবর্তী বছরগুলোতে এম.এ ও এম.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন ও চিকিৎসাসেবায় অবদান

শুরুতে চাতরা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেও, চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কলকাতার মেয়ো নেটিভ হাসপাতালে হাউস সার্জন হিসেবে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সুদক্ষ চিকিৎসক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর পারিশ্রমিক একসময় তৎকালীন সর্বোচ্চ ৬৪ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল, তবে দরিদ্র রোগীদের তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ দিতেন।

ঐতিহাসিক গৌরব ⚡

ভারতে অস্থি চিকিৎসায় প্রথম এক্স-রে ব্যবহার করার ঐতিহাসিক গৌরব স্যার নীলরতন সরকারেরই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আধুনিক প্রযুক্তি আমদানিতে তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ।

শিক্ষা বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব

শিক্ষানুরাগী এই ব্যক্তিত্ব বাংলার উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান গবেষণার প্রসারে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো এবং বিজ্ঞান ও মেডিকেল ফ্যাকাল্টির ডিন ছিলেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি জগদীশচন্দ্র বসুর বসু বিজ্ঞান মন্দির এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতীর ট্রাস্টি বোর্ডের আজীবন সদস্য ছিলেন।

অবদান ও দেশীয় শিল্পায়ন

কলকাতায় জাতীয় মানের চিকিৎসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লক্ষ্যে তিনি জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ন্যাশনাল সোপ ফ্যাক্টরি ও ন্যাশনাল ট্যানারি কোম্পানির মতো দেশীয় শিল্পে পুঁজি বিনিয়োগ করেন। তাঁর সক্রিয় অবদানে গড়ে ওঠা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহ নিচে দেওয়া হলো—

  • আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ (তৎকালীন কারমাইকেল)
  • যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতাল
  • বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল
  • যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ
  • ন্যাশনাল সোপ ফ্যাক্টরি
  • ন্যাশনাল ট্যানারি কোম্পানি

বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

১৯২০ সালে লন্ডনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয় সম্মেলনে যোগ দিলে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.সি.এল এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এল.এল.ডি সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল অত্যন্ত গভীর। তিনি কবিগুরুর পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্নেহে “নীলু” বলে ডাকতেন। কবি তাঁর ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থটি নীলরতন সরকারকে উৎসর্গ করেছিলেন।

মহাপ্রয়াণ ও স্মৃতি রক্ষা

১৯৪৩ সালের ১৮ মে গিরিডিতে এই মহান মনীষী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলকে পূর্ণাঙ্গ কলেজে রূপান্তর করে ‘নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ নামকরণ করা হয়, যা আজও চিকিৎসা সেবায় এক অনন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

home3