Bangla Panjika 2026

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৫ মে ১৮১৭ – ১৯ জানুয়ারি ১৯০৫) ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রচার, সমাজসংস্কার, শিক্ষা বিস্তার এবং আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৮১৭ সালের ১৫ মে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং মাতা দিগম্বরী দেবী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর চতুর্দশ সন্তান।

শিক্ষা ও ভাবনার পরিবর্তন

শৈশবে বাড়িতেই তাঁর শিক্ষার সূচনা হয়। পরে তিনি অ্যাংলো হিন্দু কলেজ-এ পড়াশোনা করেন, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্বও সামলাতেন।

১৮৩৮ সালে পিতামহীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। তিনি ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মহাভারত, উপনিষদ এবং বিভিন্ন প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দর্শন অধ্যয়নের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরচিন্তা ও মানবকল্যাণের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেন。

তত্ত্ববোধিনী সভা ও ব্রাহ্মসমাজ

১৮৩৯ সালে তিনি ‘তত্ত্বরঞ্জনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ নামে পরিচিত হয়। ১৮৪২ সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজ-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’, যার সম্পাদক ছিলেন অক্ষয়কুমার দত্ত।

দেবেন্দ্রনাথ উপনিষদ ও বেদের ভাবধারাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করেন। তিনি ব্রহ্মোপাসনার একটি নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন এবং ধর্মীয় আচারকে আরও সরল ও যুক্তিনির্ভর করে তোলার চেষ্টা করেন।

শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা ✨

১৮৬৭ সালে বীরভূমের ভুবনডাঙ্গায় তিনি একটি আশ্রম স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে বিখ্যাত শান্তিনিকেতন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে এই স্থানই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে বিশ্বভারতীর কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সমাজসংস্কার ও রাজনীতি

দেবেন্দ্রনাথ সমাজসংস্কারমূলক কাজেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি বিধবাবিবাহের পক্ষে মত দেন এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন। শিক্ষাবিস্তারে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

তিনি কিছু সময় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন এবং ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবিও উত্থাপন করেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • ব্রাহ্মধর্ম
  • আত্মতত্ত্ববিদ্যা
  • ব্রাহ্মধর্মের মত ও বিশ্বাস
  • কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা
  • জ্ঞান ও ধর্মের উন্নতি
  • পরলোক ও মুক্তি
  • শ্রীমন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী

মৃত্যু

১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতায় ৮৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ধর্মচিন্তা, সমাজসংস্কার এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও বাংলার ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয়।

home3