
রাসবিহারী বসু (২৫ মে ১৮৮৬ – ২১ জানুয়ারি ১৯৪৫) ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সাহসী ও প্রভাবশালী বিপ্লবী নেতা। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি শুধু ভারতের মাটিতেই নয়, বিদেশেও স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিলেন এবং পরবর্তীকালে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের পথ প্রস্তুত করেছিলেন।
জন্ম ও শৈশব
১৮৮৬ সালের ২৫ মে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার সুবলদহ গ্রামে রাসবিহারী বসুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন বিনোদবিহারী বসু এবং মা ভুবনেশ্বরী দেবী। ছোটবেলার বেশিরভাগ সময় তিনি গ্রামের পরিবেশেই কাটান। দেশপ্রেমমূলক গল্প, লাঠিখেলা এবং সাহসিকতার নানা অভিজ্ঞতা তাঁর মনে স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তোলে।
শিক্ষাজীবন ও বিপ্লবী চেতনার সূচনা
প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু হলেও পরে তিনি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। তরুণ বয়স থেকেই তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। পরে দেরাদুনে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময়ও তিনি গোপনে বিভিন্ন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন।
লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর হামলা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ ⚡
রাসবিহারী বসুর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর হামলার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা। ১৯১২ সালে দিল্লিতে এই বোমা হামলার ঘটনা ব্রিটিশ শাসকদের আতঙ্কিত করে তোলে। যদিও পুলিশ তাঁকে ধরতে পারেনি, এরপর থেকেই তিনি ব্রিটিশ সরকারের নজরে চলে আসেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা
লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর হামলার পর তিনি দেশজুড়ে এক বিশাল সশস্ত্র বিদ্রোহ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ সরকারের দমনপীড়নের মুখে তাঁকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়। ব্রিটিশ পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজলেও তাঁর চতুরতা ও সাহসিকতার কারণে তাঁকে বন্দি করতে পারেনি।
জাপানে পাড়ি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ
১৯১৫ সালে তিনি গোপনে ছদ্মবেশে ভারত ছেড়ে জাপানে পাড়ি জমান। সেখানে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর একক ও নিরলস উদ্যোগে ভারতীয় স্বাধীনতা লীগ (Indian Independence League) গঠিত হয় এবং পরে প্রবাসী ভারতীয় ও যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ সংগঠিত হয়। পরবর্তীকালে তিনি এই গৌরবময় আন্দোলনের নেতৃত্ব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে তুলে দেন।
ব্যক্তিগত জীবন
জাপানে অবস্থানকালে তিনি তোশিকো সোমা নামে এক জাপানি তরুণীকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুটি সন্তান ছিল। চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপ্লবী সংগ্রামের মধ্যেও পরিবার ও সংগ্রাম—দুই দিকই তিনি সমানভাবে এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সামলেছিলেন।
সম্মাননা ও মৃত্যু
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য জাপান সরকার তাঁকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা “অর্ডার অফ দ্য রাইজিং সান”-এ ভূষিত করে। ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি জাপানেই এই মহান বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। স্বাধীনতার পর ভারত সরকারও তাঁর মহান স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
উপসংহার
রাসবিহারী বসু ছিলেন এমন এক দূরদর্শী বিপ্লবী, যিনি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দরবারে ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর অদম্য সাহস, সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম আজীবন প্রতিটি ভারতীয়কে অনুপ্রাণিত করবে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।
