
ডাঃ নীহাররঞ্জন গুপ্ত (৬ জুন ১৯১১ – ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬) বাংলা রহস্যসাহিত্যের জগতে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম। চিকিৎসক হিসেবে যেমন তিনি মানুষের সেবা করেছেন, তেমনি সাহিত্যিক হিসেবে বাঙালি পাঠককে উপহার দিয়েছেন রহস্য, রোমাঞ্চ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ভরপুর অসংখ্য কালজয়ী রচনা। বিশেষ করে তাঁর সৃষ্টি গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটী রায়’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র স্থান দখল করে রয়েছে।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
১৯১১ সালের ৬ জুন তৎকালীন যশোর জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইটনায় (বর্তমানে বাংলাদেশের নড়াইল জেলার অন্তর্গত) এক ঐতিহ্যবাহী কবিরাজ পরিবারে তাঁর জন্ম। নীহাররঞ্জনের পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর পিতা সত্যরঞ্জন গুপ্ত ও মাতা লবঙ্গলতা দেবীর উৎসাহেই ছোটবেলা থেকে সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কলকাতায় কাটলেও পিতার চাকরির সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করার সুযোগ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
শিক্ষাজীবন ও চিকিৎসাবিদ্যায় অনুরাগের পেছনের গল্প
কোন্নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করার পর তিনি কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতার কারমাইকেল মেডিকেল কলেজে (বর্তমানে আর. জি. কর মেডিকেল কলেজ) চিকিৎসাবিদ্যায় অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে সফলভাবে ডাক্তারি শিক্ষা সম্পন্ন করেন। চিকিৎসাবিদ্যার প্রতি তাঁর এই গভীর অনুরাগের পেছনে একটি ব্যক্তিগত বেদনাও কাজ করেছিল। ছাত্রাবস্থায় তাঁর বড় বোন পোকার কামড়ে মারা যান— সেই ঘটনার গভীর অভিঘাত থেকেই তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে আরও আন্তরিকভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে লন্ডন থেকে চর্মরোগ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে তিনি চিকিৎসক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন।
ডাক্তারির আড়ালে সাহিত্যিক সত্তা ✍️
চিকিৎসক পরিচয়ের আড়ালেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক সত্তা। ছাত্রজীবনেই তাঁর লেখা প্রথম গল্প একটি শিশু-কিশোর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মা লবঙ্গলতা দেবী তাঁকে সবসময় লেখালেখি চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিতেন। সেই উৎসাহ থেকেই শুরু হয় নিয়মিত সাহিত্যচর্চা, যা পরবর্তীতে বাংলা রহস্য ও গোয়েন্দা কাহিনির জগতে এক নতুন ও স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করে।
রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা ও লেখনীর উপাদান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং মেজর পদে বিভিন্ন দেশে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে বার্মা (মিয়ানমার), মিশরসহ নানা অঞ্চলে ঘোরার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করে। বিদেশি পরিবেশ, যুদ্ধকালীন চরম উত্তেজনা, মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং অজানা রহস্যের মেলবন্ধন— এসব উপাদানই তাঁর লেখায় এক আলাদা বৈচিত্র্যময় মাত্রা এনে দিয়েছিল।
‘কিরীটী রায়’ ও জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দু
বাংলা সাহিত্যে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান নিঃসন্দেহে ‘কিরীটী রায়’ চরিত্রের সৃষ্টি। কিরীটী ছিলেন শান্ত, বুদ্ধিমান, পর্যবেক্ষণশক্তিতে তীক্ষ্ণ এবং বিশ্লেষণক্ষমতায় অনন্য এক গোয়েন্দা। বাংলা রহস্যসাহিত্যে ব্যোমকেশ বা ফেলুদার পাশাপাশি কিরীটীও সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাঁর প্রথম দিকের গোয়েন্দা উপন্যাস ‘কালোভ্রমর’ পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলেছিল। এরপর একের পর এক রহস্যোপন্যাস তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেয়।
কালজয়ী উপন্যাস ও চলচ্চিত্র রূপায়ন
শুধু রহস্যকাহিনি নয়, মানবসম্পর্ক, সমাজবাস্তবতা এবং আবেগঘন কাহিনিও তিনি অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর বহু বিখ্যাত রচনা বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের জনপ্রিয়তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তাঁর অসংখ্য উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নিচে দেওয়া হলো—
- কালোভ্রমর
- মৃত্যুবাণ
- উল্কা
- উত্তর ফাল্গুনী
- কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী
- রাতের রজনীগন্ধা
ব্যক্তিজীবন ও শেষ প্রস্থান
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। চিকিৎসকের চেম্বার, নিয়মিত লেখালেখি, পূজাপাঠ, পোষা প্রাণীর যত্ন এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা— সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি তাঁর আজীবন গভীর টান ছিল এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের খবরও তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে নিয়মিত অনুসরণ করতেন।
১৯৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চিকিৎসক প্রয়াত হন। ৬ জুন ডাঃ নীহাররঞ্জন গুপ্তের জন্মদিনে রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ। রহস্যসাহিত্যের জগতে তাঁর অবদান বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
