Bangla Panjika 2026

মাস্টারদা সূর্য সেন: চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল অভিযানের কিংবদন্তি বিপ্লবী

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কজন মানুষ ব্রিটিশ রাজদণ্ডকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস দেখিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সূর্য কুমার সেন (২২ মার্চ ১৮৯৪ – ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪) অন্যতম। তবে ইতিহাস তাঁকে এই নামে যতটা চেনে, তার চেয়েও বেশি হৃদয়ে আগলে রেখেছে ‘মাস্টারদা’ হিসেবে। কেবল একজন শিক্ষকই নন, তিনি ছিলেন মুক্তিকামী মানুষের চেতনার বাতিঘর।

শৈশব ও আদর্শের বুনন

চট্টগ্রামের রাউজানে এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি শৈশব থেকেই ছিলেন ধীরস্থির এবং অত্যন্ত মেধাবী। অল্প বয়সেই মা-বাবাকে হারিয়ে কাকার স্নেহে বড় হন। ছাত্রজীবন থেকেই স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর শান্ত চোখের আড়ালে যে এক অগ্নিপুরুষ লুকিয়ে আছে, তা হয়তো সে সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

শিক্ষকতা ও ‘মাস্টারদা’ হয়ে ওঠা

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন অংকের শিক্ষক। চট্টগ্রামের উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় থেকেই তিনি ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর নম্র ব্যবহার আর দেশপ্রেমের মন্ত্র শিক্ষার্থীদের বিপ্লবের পথে উদ্বুদ্ধ করত। এই শিক্ষকতা পেশার সূত্র ধরেই তিনি সবার প্রিয় ‘মাস্টারদা’ হিসেবে পরিচিতি পান।

বিপ্লবী দর্শন ✨

“কে জানতো যে সেই নিরীহ শিক্ষকের স্থির প্রশান্ত চোখ দুটি একদিন জ্বলে উঠে মাতৃভূমির দ্বিশতাব্দীব্যাপি অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হবে?”

বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র ও গোপন সংগঠন

কলেজ জীবনেই সূর্য সেন সরাসরি বিপ্লবী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি গড়ে তোলেন শক্তিশালী এক গোপন বিপ্লবী দল। তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবীরা ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল ও স্বাধীন সরকার

মাস্টারদার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং গৌরবময় অধ্যায় হলো চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযান। তাঁর অকুতোভয় নেতৃত্বে একদল তরুণ বিপ্লবী ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার দখল করেন, টেলিফোন-টেলিগ্রাফ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং রেল যোগাযোগ বন্ধ করে চট্টগ্রামকে কয়েকদিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করেন। তিনি সেখানে একটি অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠন করেছিলেন, যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের ভিতে এক প্রবল আঘাত।

জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ

অস্ত্রাগার দখলের পর বিপ্লবীরা জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান নেন। সেখানে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে তাঁদের এক ভয়াবহ সম্মুখ যুদ্ধ হয়। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম সাহসে লড়াই করে বিপ্লবীরা প্রমাণ করেছিলেন যে, দেশপ্রেমের শক্তির কাছে মৃত্যুভয় তুচ্ছ।

নারী জাগরণ ও বীর বিপ্লবীগণ 📚

মাস্টারদা বিশ্বাস করতেন, দেশের মুক্তি আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাঁর হাত ধরেই বাংলার অগ্নিকন্যারা সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেন।

  • প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
  • কল্পনা দত্ত
  • অনন্ত সিং
  • গণেশ ঘোষ
  • লোকেইনাথ বল
  • নির্মল সেন
  • অম্বিকা চক্রবর্তী
  • তারকেশ্বর দস্তিদার

শেষ লড়াই ও মহাপ্রয়াণ

দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থেকেও মাস্টারদা তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার হাত থেকে রেহাই পাননি এই বীর। অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। বন্দি অবস্থায় তাঁর ওপর চালানো হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি শান্ত মুখে ফাঁসির দড়ি বরণ করে নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন অমর।

উপসংহার

মাস্টারদা সূর্য সেন কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি আদর্শ। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কলকাতার মেট্রো স্টেশন—সর্বত্র তাঁর নাম সগৌরবে উচ্চারিত হয়। মাস্টারদার শেষ বাণী ছিল— “আদর্শ ও একতা”। সেই আদর্শকে বুকে নিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এগিয়ে যাবে স্বপ্নের স্বাধীন ও সার্বভৌম পথে।

home3