
এক বিশাল জলাশয়ে নানা জলচর প্রাণী বাস করত। জলাশয়টা এত গভীর ছিল যে কখনই এর জল শুকিয়ে যেতো না। ফলে জলচর প্রাণীরা মনের আনন্দেই থাকতো সেখানে।
সেখানে প্রচুর শিকার পাওয়া যায় বলে সেই জলাশয়ের তীরে এক বটগাছে অনেকগুলি বক আস্তানা নিয়েছিল। সেই বকদের মধ্যে ছিল একটি বৃদ্ধ বক। বয়স হয়ে যাওয়ায় সে চোখে ভাল দেখতেও পেত না, তাই ভাল শিকার ধরতে পারত না বলে প্রায় দিনই তাকে উপোস করে থাকতে হতো।
নিজের দুরবস্থার কথা ভাবতে ভাবতে একদিন বকের মাথায় একটা মতলব এল। অমনি সে গাছের নীচে নেমে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল। সেই পথ দিয়ে গুটি গুটি হেঁটে চলেছিল একটা কাঁকড়া। সে বককে অমন করে চোখের জলে ভাসতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কি হলো মামা অমন করে কাঁদছ কেন তুমি?
বক বলল, ভাগ্নে দুঃখের কথা তোমাকে আর কি বলব, কাল জেলেদের কাছে শুনতে পেলাম, বার বছর নাকি ভয়ানক অনাবৃষ্টি হবে – ছিটেফোঁটা বৃষ্টিও হবে না কোথাও। কাঁকড়া বকের কথা শুনে ভয়ে আঁতকে উঠে বলল, সর্বনাশ, তাহলে আমরা বাঁচব কি করে মামা?
বক বলল, এর মধ্যেই তো যারা যেতে পারছে অন্য গভীর জলাশয়ে চলে যেতে শুরু করেছে। এতকাল যাদের নিয়ে সুখে ছিলাম, তাদের ছেড়ে কি করে যে আমার দিন যাবে সেই দুঃখেই খাবার রুচি চলে গেছে। কেবল চোখ ফেটে জল আসছে। ঠিক করেছি, আর কিছু মুখে তুলব না আমি। যে কয়দিন বাঁচি সন্ন্যাসীদের মত হাওয়া খেয়েই বাঁচব।
কাঁকড়া তো এই দুঃসংবাদটা তখুনি গিয়ে জলের তলায় পৌঁছে দিল। অমনি মাছ, কচ্ছপ – এরা সব ছুটে এল বকের কাছে। এসে বককে চেপে ধরল, মামা, আমাদের বাঁচার উপায় কি হবে তাহলে? আমরা তো অন্য কোথাও যেতে পারব না, তাহলে কি এখানেই শুকিয়ে মরতে হবে?
বক বলল, উপায় আমি একটা করতে পারি- এখন তোমরা যদি রাজী হও। পাশেই কিছুটা দূরে খুব গভীর একটা দীঘি আছে, সেখানে আমি তোমাদের পিঠে করে নিয়ে গিয়ে রেখে আসতে পারি। তোমরা বেঁচেবর্তে থাকলেই আমার শান্তি। আমার জীবন তো শেষ হয়ে এল, তোমাদের উপকারে এইটুকু কাজ করে যেতে পারলেই শান্তি পাব। সকলেই একবাক্যে বকের কথায় রাজী হয়ে গেল। আর সেদিন থেকেই একটি একটি করে মাছ পিঠে চাপিয়ে বক উড়ে যেতে লাগল।
বকের তো মতলব ঠিক করাই ছিল। জলাশয়ে নিয়ে যাবার নাম করে সে মাছদের পিঠে করে খানিক দূরে উড়ে গিয়েই সেগুলোকে মজা করে খেতে লাগল।
এমনি করে বেশ কিছুদিন চলল।
একদিন কাঁকড়া এসে হাজির হল বকের কাছে। বলল, মামা, সবার আগে আমারই তোমার সঙ্গে কথা হয়েছিল, আর তুমি আমাকেই এখনও এখানে ফেলে রেখেছ।
কাঁকড়ার কথা শুনে বক মনে ভাবল, ভালই হল, অনেক দিন মাছ খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে। কাঁকড়া দিয়ে আজ মুখ ফেরানো যাক। সে তখন কাঁকড়াকে বলল, চল ভাগ্নে, আজ তোমাকে নিয়েই যাব। কেন আর এখানে পড়ে থাকবে?
এই বলে বক তো কাঁকড়াকে পিঠে চাপিয়ে যেখানে রোজ মাছ মেরে খায় সেখানে এসে হাজির হল।
কাঁকড়া দেখল, চারিদিকে মাছের কাঁটা পড়ে আছে কোথায় দীঘি কোথায় কি? সে বলল, মামা, আমাকে কোথায় নিয়ে এলে তুমি? দীঘি কোথায়?
বক বলল, আমার পেটে। এবার তোকেও ওখানে পাঠিয়ে দেব!
কাঁকড়া বুঝতে পারল, বক ওদের সকলকেই ঠকিয়েছে। রোজ যে সব মাছ সে দীঘিতে নিয়ে যাচ্ছে বলে নিয়ে আসত তাদের এখানে নিয়ে এসে পেটে পুরতো।
কাঁকড়া তখনো বকের পিঠের ওপরেই ছিল। কাঁকড়া সেই মুহুর্তে তার ধারালো দুটো দাঁড়া দিয়ে বকের সরু গলা চেপে ধরল। তারপর প্রাণপণে চেপে মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে ফেলল।
মানুষের মনের মধ্যে ভাল বা মন্দ যা থাকে, তা যতই গোপন হোক, জানা যায় ঘুমের মধ্যে বা নেশার ঘোরে বলা তার কথা থেকে।
ওষুধ অর্থ সুপরামর্শ ও মহৎজনের বুদ্ধি-এসব যার সহায় সে অসাধ্য সাধন করতে পারে।
শত্রু সামান্য সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে ধ্বংসের কারণ করে তোলে যেমন ছোট্ট ফুটো দিয়ে ঢুকে বানের জল ধীরে ধীরে নৌকো ডুবিয়ে দেয়।
যারা কাচকে ভাবে মনি আর মনিকে ভাবে কাচ তাদের অধীনে কখনো কাজ করতে নেই।
কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়।
বাচালতা সর্বনাশের মূল।
