
ভারতীয় ও বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নাম (১৪ মে ১৯২৩ – ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮) মৃণাল সেন। তিনি শুধু একজন পরিচালক নন, ছিলেন সমাজমনস্ক গল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও লেখকও। বাস্তব জীবন, সমাজের টানাপোড়েন এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাঁর ছবিতে বারবার উঠে এসেছে।
প্রাথমিক জীবন
১৯২৩ সালের ১৪ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন মৃণাল সেন। স্কুলজীবন শেষ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় আসেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-এ পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন।
ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ)-এর মাধ্যমে নাটক ও সংস্কৃতির জগতে সক্রিয় ভূমিকা নেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সাংবাদিকতা, ওষুধ বিপণন এবং চলচ্চিত্রে শব্দ প্রযুক্তির কাজও করেছিলেন।
চলচ্চিত্র জীবন
১৯৫৫ সালে তাঁর প্রথম ছবি রাত ভোর মুক্তি পায়। যদিও ছবিটি বড় সাফল্য পায়নি, তবে পরবর্তী ছবি নীল আকাশের নিচে তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। বাইশে শ্রাবণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ভুবন সোম ভারতীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্র ধারায় এক নতুন দিশা দেখায়। ছবিতে অভিনয় করেছিলেন উৎপল দত্ত। পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত ‘কলকাতা ট্রিলজি’—
- ইন্টারভিউ (১৯৭১)
- কলকাতা ৭১ (১৯৭২)
- পদাতিক (১৯৭৩)
এই তিনটি ছবিতে তিনি সেই সময়ের অস্থির সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরেন। মধ্যবিত্ত সমাজের সংকট ও মূল্যবোধ উঠে আসে এক দিন প্রতিদিন (১৯৭৯) এবং খারিজ (১৯৮২)-এ। খারিজ ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসব-এ বিশেষ জুরি পুরস্কার লাভ করে।
আকালের সন্ধানে ✨
তাঁর আরেক উল্লেখযোগ্য ছবি আকালের সন্ধানে (১৯৮০), যেখানে ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে তুলে ধরা হয়। এই চলচ্চিত্রটি বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এ ‘সিলভার বেয়ার’ সম্মান অর্জন করে।
বাংলার পাশাপাশি তিনি হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলুগু ভাষাতেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মাটির মনীষ, ওকা উরি কথা এবং জেনেসিস তাঁর বহুভাষিক কাজের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সাহিত্য ও লেখালেখি
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি লেখালেখিতেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। সিনেমা, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর একাধিক বই ও চিত্রনাট্য প্রকাশিত হয়েছে।
- চার্লি চ্যাপলিন
- সিনেমা আধুনিকতা
- মন্টেজ: লাইফ, পলিটিক্স, সিনেমা
পুরস্কার ও সম্মান
বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর কাজ প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হয়েছে। তিনি যেসব গুরুত্বপূর্ণ সম্মান পেয়েছেন—
- ১৯৮১ সালে ভারতের পদ্মভূষণ
- ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার
- ফ্রান্স সরকারের Ordre des Arts et des Lettres সম্মান
- ২০০০ সালে রাশিয়ার Order of Friendship সম্মান
- ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ভারতের সংসদের মনোনীত সদস্য
মৃত্যু
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ৯৫ বছর বয়সে কলকাতার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মৃণাল সেন। তবে তাঁর চলচ্চিত্র ও চিন্তাধারা আজও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
