
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় (৩০ মার্চ ১৮৯৯ – ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭০) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি লেখক, কথাশিল্পী, চিত্রনাট্যকার এবং বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা কাহিনীর অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী আজও বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় অংশ।
তাঁর জন্ম হয়েছিল উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর শহরে নিজ মাতুলালয়ে। আদিনিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার বরানগর কুঠিঘাট অঞ্চলে। কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে আইন নিয়ে পড়াশোনার সময়েই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। মাত্র বিশ বছর বয়সে তাঁর প্রথম সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়।
ব্যোমকেশ বক্সী ও গোয়েন্দা সাহিত্য
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি হল গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী। নিজেকে তিনি “সত্যান্বেষী” বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। প্রথমে অজিতের কলমে লেখা হলেও পরবর্তীকালে তৃতীয় পুরুষে লেখা শুরু করেন। ব্যোমকেশের গল্পগুলো আজও পাঠকদের মধ্যে অসম্ভব জনপ্রিয়।
ঐতিহাসিক ও সামাজিক রচনা
গোয়েন্দা কাহিনী ছাড়াও শরদিন্দু ঐতিহাসিক উপন্যাস ও গল্প রচনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক রচনার মধ্যে রয়েছে কালের মন্দিরা, গৌড়মল্লার, তুমি সন্ধ্যার মেঘ, তুঙ্গভদ্রার তীরে প্রভৃতি। সামাজিক উপন্যাসের মধ্যে জাতিস্মর ও বিষের ধোঁয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া অতিপ্রাকৃত রহস্য নিয়ে তাঁর বরদা সিরিজ (ভূতান্বেষী বরদা) এখনো পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি ছোটগল্প এবং শিশুসাহিত্য রচনাতেও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর সৃষ্ট আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হল মরাঠা বীর শিবাজীর অভিযানের সঙ্গে যুক্ত সদাশিব।
সিনেমার সঙ্গে যোগাযোগ
সাহিত্যের পাশাপাশি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় চলচ্চিত্র জগতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি বম্বে টকিজে চিত্রনাট্যকার হিসেবে যোগ দেন। তিনি ভাবী, বচন, দুর্গা, কঙ্গন, নবজীবন, আজাদ, পুনর্মিলনসহ একাধিক ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন।
তাঁর রচনা অবলম্বনে নির্মিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:
- চিড়িয়াখানা — পরিচালক: সত্যজিৎ রায়
- ঝিন্দের বন্দী — পরিচালক: তপন সিংহ
- দাদার কীর্তি — পরিচালক: তরুণ মজুমদার
- বিষের ধোঁয়া
এছাড়া তাঁর ঐতিহাসিক ছোটগল্প মরু ও সঙ্ঘ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে পুরস্কারপ্রাপ্ত হিন্দি ছবি তিশগ্নি।
পুরস্কার ও সম্মাননা
তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার (উপন্যাস তুঙ্গভদ্রার তীরের জন্য), শরৎচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, মতিলাল পুরস্কারসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেন।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা আজও বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। ব্যোমকেশ বক্সী থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক উপন্যাস, ভৌতিক গল্প — তাঁর সৃষ্টি বিভিন্ন ধারায় পাঠকদের মুগ্ধ করে চলেছে।
