Bangla Panjika 2026

গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: অবিভক্ত বাংলার যশস্বী চিকিৎসক ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব

গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ( ১৭ ডিসেম্বর, ১৮৩৬ – ১৩ ডিসেম্বর, ১৮৮৯) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক, লেখক ও চিকিৎসা-শিক্ষার পথিকৃৎ। সমাজসেবা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং বাংলা ভাষায় চিকিৎসা-জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর মানবিকতা ও কর্মজীবন তাঁকে জনসাধারণের কাছে এক আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

পরিবার ও প্রারম্ভিক জীবন

গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার জিরাট–বলাগড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হওয়ায় দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই তাঁর শিক্ষাজীবন এগিয়ে চলে। তবুও, অদম্য মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে তিনি নিজেকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

শিক্ষাজীবন ও পেশা নির্বাচন

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে, তিনি সেই বছরেই এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এক পর্যায়ে তিনি আইন পড়া শুরু করলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে মেডিক্যাল শিক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কর্মজীবন ও মানবিকতা 🩺

চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে তাঁর চিকিৎসা পেশা শুরু করেন। দয়ালু, মানবিক ও দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে তিনি দ্রুতই সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেন।

চিকিৎসা-সাহিত্যে অবদান

চিকিৎসা-পেশার পাশাপাশি গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নিয়মিত লেখালেখিতেও যুক্ত ছিলেন। সাধারণ মানুষের উপকারের কথা ভেবে তিনি বাংলায় চিকিৎসা সংক্রান্ত সহজবোধ্য গ্রন্থ রচনা করে চিকিৎসা-জ্ঞানকে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দেন।

  • তিনি বাংলায় চিকিৎসা সংক্রান্ত সহজবোধ্য গ্রন্থ ‘মাতৃশিক্ষা’ এবং ‘চিকিৎসা প্রকরণ’ রচনা করেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
  • সেই সময়ে বাংলায় চিকিৎসাশাস্ত্রের পাঠ্যবইয়ের অভাব পূরণের জন্য তিনি ইংরেজি চিকিৎসা গ্রন্থের বাংলায় অনুবাদ করেন।
  • তিনি Practice of Medicine গ্রন্থের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং Anatomy বিষয়ক গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন, যা তৎকালীন মেডিক্যাল ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল।

বহুমুখী প্রতিভা ও উত্তরাধিকার

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি বাল্মীকি রামায়ণের একটি ছন্দোবদ্ধ বাংলা অনুবাদ করেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় বহন করে। ব্যক্তিজীবনে তাঁর স্ত্রী ছিলেন জগত্তারিণী দেবী। বাংলার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর একমাত্র সন্তান।

স্বল্পকালীন অসুস্থতার পর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাংলা ভাষায় চিকিৎসা-জ্ঞান বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে কলকাতার ভবানীপুর এলাকায় তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।

home3