
শৈশব ও শিক্ষা
চন্দ্রশেখর আজাদ (২৩ জুলাই ১৯০৬ – ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩) এর আসল নাম ছিল চন্দ্রশেখর তিওয়ারি। মধ্যপ্রদেশের আলিরাজপুর জেলার ভাওরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সীতারাম তিওয়ারি ও মাতা জাগরণী দেবী ভেবেছিলেন ছেলেকে সংস্কৃতজ্ঞ বানাবেন, তাই বেনারসের কাশী বিদ্যাপীঠে পাঠান। কিন্তু ১৯১৯-এর জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড কিশোর মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
‘আজাদ’ নামের জন্ম
১৯২১-এ মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেপ্তার হন। আদালতে নাম, পিতার নাম ও ঠিকানার জায়গায় যথাক্রমে ‘আজাদ’, ‘স্বাধীনতা’ ও ‘জেল’ বলায় বিচারক ১৫ বেত্রাঘাতের আদেশ দেন। সেই থেকে তিনি চন্দ্রশেখর ‘আজাদ’—যিনি সিদ্ধান্ত নেন জীবিত অবস্থায় ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা দেবেন না।
বিপ্লবী পথযাত্রা
গান্ধী অহিংস আন্দোলন প্রত্যাহার করলে আজাদ মনে করেন সশস্ত্র লড়াই ছাড়া মুক্তি আসবে না। রাম প্রসাদ বিসমিল-এর মাধ্যমে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HRA)-এ যোগ দেন এবং ১৯২৫-এর কাকোরি ট্রেন অভিযান সফল করেন। বিচারে সহযোদ্ধাদের ফাঁসি হলেও তিনি লুকিয়ে থাকতে সমর্থ হন।
HSRA ও লালা লাজপত রায়ের প্রতিশোধ
১৯২৮-এ ভগৎ সিং-সহ সংগঠনটি হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA) নামে পুনর্গঠন করেন। একই বছরে লালা লাজপত রায় পুলিশের লাঠিচার্জে মৃত্যুবরণ করলে আজাদ-ভগৎ সিং-রাজগুরু দলটি পুলিশ অফিসার জে.পি. সান্ডার্সকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়।
শেষ লড়াই
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১, এলাহাবাদের (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) আলফ্রেড পার্কে পুলিশ ঘিরে ফেললে তিনি একাই জবাব দেন। শেষ গুলি বাঁচিয়ে রেখে নিজের মাথায় চালিয়ে ব্রিটিশদের হাতে বন্দী না হয়ে জীবন শেষ করেন। মাত্র ২৪ বছরের জীবনে তিনি স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগের প্রতীক হন।
ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
- শারীরিক-মানসিক দৃঢ়তা, দ্রুত সিদ্ধান্তের দক্ষতা ও সংগঠন গড়ার ক্ষমতায় তিনি ‘কুইক সিলভার’ উপাধি পান।
- প্রিয় অস্ত্র ছিল .৩২ কোল্ট পকেট পিস্তল, যা আজও প্রয়াগরাজ জাদুঘরে রক্ষিত।
- ভগৎ সিং-এর আদর্শিক গুরু; পরবর্তী প্রজন্মের সমাজতন্ত্রী যুবাদের অনুপ্রেরণা।
- আলফ্রেড পার্কটি তাঁর স্মৃতিতে ‘চন্দ্রশেখর আজাদ পার্ক’ নামে পরিচিত।
সংস্কৃতিতে ছাপ
১৯৬৫-এর ‘শহীদ’ থেকে ২০০৬-এর ‘রং দে বসন্তী’—বহু ভারতীয় ছবিতে আজাদের চরিত্র ফুটে উঠেছে। তাঁর অদম্য সাহস ও আত্মবলিদান আজও সিনেমা, সাহিত্য ও লোকগাথায় চিরভাস্বর।
উপসংহার
চন্দ্রশেখর আজাদ স্বাধীন ভারতের স্বপ্নকে নিজের জীবন দিয়ে সিঞ্চিত করেন। তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা—“বন্দী হব না”—একুশ শতকের তরুণ-তরুণীদেরও প্রতিবাদী, ন্যায়প্রিয় হতে শিখিয়ে যায়। আজাদ থেকে আমরা শিখি: সত্যিকার স্বাধীনতা কেবল শৃঙ্খল ভাঙা নয়, আত্মমর্যাদারও নাম।
