Bangla Panjika 2026

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু — স্বাধীন ভারতের স্থপতি ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু (১৪ নভেম্বর ১৮৮৯ — ২৭ মে ১৯৬৪) ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা, স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগণ্য সংগ্রামী এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই রাজনীতিবিদ একই সঙ্গে একজন খ্যাতনামা লেখক ও কূটনীতিবিদও ছিলেন। তাঁর ইংরেজি রচিত তিনটি বই—An Autobiography, Glimpses of World HistoryThe Discovery of India—চিরায়ত সাহিত্যের মর্যাদা অর্জন করেছে।

  • জন্ম: এলাহাবাদ, গঙ্গা নদীর তীরে (বর্তমান প্রয়াগরাজ)।
  • পরিবার: পিতা মতিলাল নেহরু (ধনী ব্যারিস্টার) ও মা স্বরূপ রানি; দুই বোন বিজয়া লক্ষ্মী ও কৃষ্ণা।
  • শিক্ষাজীবন: এলাহাবাদের আধুনিক স্কুল → হ্যারো স্কুল, ইংল্যান্ড → কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ (প্রকৃতিবিজ্ঞান) → ব্যারিস্টারি অধ্যয়ন; ছাত্রাবস্থায় ভারতীয় ছাত্র সংসদের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন।

গান্ধীর সত্যাগ্রহ-আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে বিলাসী জীবন ত্যাগ করেন, খাদির পোশাক ধারণ করেন এবং উত্তর ভারতের জনপ্রিয় সংগঠকে পরিণত হন। ১৯২৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে রাভি নদীর তীরে পূর্ণ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন; ১৯৩০ এর ২৬ জানুয়ারি কংগ্রেস ‘পূর্ণ স্বরাজ’ ঘোষণা করে, আর নেহরু গ্রেফতার হন। ১৯৩১-৩৫ পর্যন্ত অধিকাংশ সময় তিনি ও তাঁর পরিবার জেলে কাটান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে কংগ্রেস ১৯৪২-এ “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের ডাক দেয়। নেহরু শুরুতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও দলের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়ে দেশব্যাপী সফর করেন এবং ৯ আগস্ট ১৯৪২-এ গ্রেফতার হন। ১৯৪৫-এ মুক্তি পেয়ে ১৯৪৬-এর নির্বাচন ও স্বাধীনতার রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৫ আগস্ট ১৯৪৭: লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর শাসনামলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয়, ভারত-পাকিস্তান (১৯৪৭-৪৮) ও ভারত-চীন (১৯৬২) যুদ্ধ সংঘটিত হয়, আর শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে “নেহরু-লিয়াকত চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়। তিনি টানা ২৭ মে ১৯৬৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

  • দাম্পত্য: ১৯১৬-এ কমলা নেহরু; কন্যা—ইন্দিরা গান্ধী (পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী)।
  • প্রিয় বই: An Autobiography, Glimpses of World History, The Discovery of India
  • নীতি-দর্শন: ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও উদার গণতন্ত্রে আস্থা।

নেহরুর ওপরাংশে উচ্চ বন্ধনীযুক্ত ফিতে-সহ কোটটি পরে সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেন। টাইম ম্যাগাজিনের আধুনিক ফ্যাশন তালিকায় এ কোটটি ফিদেল কাস্ত্রো ও মাও সে-তুংয়ের ঐতিহাসিক পোশাকের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ভারত-চীন যুদ্ধের পর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে; ২৭ মে ১৯৬৪ তিনি দিল্লিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মদিন ভারতে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়, আর রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে ‘নেহরু-গান্ধী’ বংশ আজও ভারতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।

জওহরলাল নেহরু শুধু স্বাধীন ভারতের স্থপতি নন; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতি ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের রূপরেখা রেখে গেছেন। তাঁর দর্শন ও নেতৃত্ব—বিশেষত “Tryst with Destiny” ভাষণ—আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

home3