
বাঙালি মনীষার আকাশে ডঃ ক্ষুদিরাম দাস (৯ অক্টোবর ১৯১৬ – ২৮ এপ্রিল ২০০২) ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ এবং প্রথিতযশা ভাষাতত্ত্ববিদ। চরম দারিদ্র্য আর সামাজিক প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি যেভাবে সারস্বত সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, তা আজও অনুকরণীয়।
প্রারম্ভিক জীবন ও সংগ্রামী ছাত্রকাল
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা সতীশ চন্দ্র দাস এবং মাতা কামিনীবালা দেবীর অভাবের সংসারেও ক্ষুদিরামের মেধার দ্যুতি ম্লান হয়নি। গ্রাম্য পাঠশালা থেকে শুরু করে বাঁকুড়া জেলা স্কুল এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়— সর্বত্রই তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
অবিশ্বাস্য রেকর্ড 🏆
১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা এম.এ-তে ৭২.৬% নম্বর পেয়ে তিনি স্যার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দেন। এই কৃতিত্বের জন্য তিনি ৫টি স্বর্ণপদক লাভ করেন।
কর্মজীবন ও রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক পদ
ক্ষুদিরাম দাসের কর্মজীবন ছিল খুবই উজ্জ্বল। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ, কৃষ্ণনগর কলেজ এবং মৌলানা আজাদ কলেজের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক ‘রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক’ পদে আসীন হন— যে পদে একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দীনেশ্চন্দ্র সেনের মতো ব্যক্তিরা অধিষ্ঠিত ছিলেন।
রবীন্দ্র-গবেষণা ও ডি.লিট প্রাপ্তি
১৯৬২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখ্য যে, এটিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম কোনো বাংলা থিসিস যা এই সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রবীন্দ্র প্রতিভার পরিচয়’ রবীন্দ্র-সমালোচনার ধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন অধ্যাত্মবাদী কবি নন, বরং আধুনিক কালের এক সার্থক ‘রোমান্টিক-মিস্টিক’ কবি।
ভাষাতত্ত্ব ও সাঁওতালি-বাংলা অভিধান
ডঃ দাসের একটি অনন্য অবদান হলো বাংলা ভাষার শিকড় সন্ধানে তাঁর গবেষণা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বাংলা ভাষার বিবর্তনে সাঁওতালি ও অন্যান্য অনার্য ভাষার গভীর প্রভাব রয়েছে। তাঁর রচিত ‘সাঁওতালি বাংলা সমশব্দ অভিধান’ এই চিন্তারই সার্থক প্রতিফলন।
“ক্ষুদিরামবাবু আবিষ্কার করেছেন যে বাংলা ভাষার অসংখ্য শব্দ এসেছে সাঁওতালি ভাষা থেকে… তিনি আমাদের অতীত সম্বন্ধে আমাদের সচেতন করেছেন।” — অন্নদাশঙ্কর রায়
জীবনদর্শন ও সমাজসেবা
বিপুল পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন আড়ম্বরহীন। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি আর জহরকোট ছিল তাঁর ভূষণ। দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ মমতা। প্রতি ঈদে বা পুজোয় তিনি গরিব মানুষদের বস্ত্র দান করতেন। এমনকি একজন দক্ষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে তিনি বিনামূল্যে রোগীদের চিকিৎসা করতেন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী 📚
- রবীন্দ্র প্রতিভার পরিচয় (১৯৫৩)
- বাংলা কাব্যের রূপ ও রীতি (১৯৫৮)
- বৈষ্ণব রস প্রকাশ (১৯৭২)
- সাঁওতালি বাংলা সমশব্দ অভিধান (১৯৯৮)
- সম্পাদিত: কবিকঙ্কন চণ্ডী (১৯৭৬)
সম্মান ও স্বীকৃতি
- বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৪)
- রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯৪)
- সরোজিনী বসু স্বর্ণ পদক (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)
- জন্মশতবর্ষে কৃষ্ণনগরে তাঁর আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।
উপসংহার
২৮ এপ্রিল ২০০২ সালে এই জ্ঞানতপস্বীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর কাজ, বিশেষ করে বাংলা অভিধান ও রবীন্দ্র-গবেষণায় তাঁর অবদান বাঙালির হৃদয়ে তাঁকে অমর করে রাখবে। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘শিক্ষকদের শিক্ষক’।
