Bangla Panjika 2026

মনমোহন ঘোষ: ভারতের প্রথম ব্যারিস্টার একজন বিস্মৃত সমাজ সংস্কারক

মনমোহন ঘোষ (১৩ই মার্চ ১৮৪৪ – ১৬ই অক্টোবর ১৮৯৬) ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম ব্যারিস্টার। ভারতীয় জাতীয় রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে নারীশিক্ষার বিস্তার এবং বিচারব্যবস্থার আধুনিকীকরণে তিনি যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আজও সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করা হয়।

পারিবারিক ইতিহাস

মনমোহন ঘোষের শিকড় ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। তাঁর পিতা রামলোচন ঘোষ ছিলেন একজন প্রগতিশীল উপবিচারপতি এবং দেশপ্রেমিক। রাজা রামমোহন রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত রামলোচন বাবুর উদার চিন্তাধারা তাঁর সন্তানদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। মনমোহনের ভাই লালমোহন ঘোষও ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যারিস্টার এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি।

ছাত্রজীবন ও সংগ্রাম

বাল্যকালে তিনি কৃষ্ণনগরে শিক্ষালাভ করেন এবং ১৮৫৯ সালে সেখান থেকেই এন্ট্রান্স পাস করেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়ার সময় কেশবচন্দ্র সেনের সাথে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তাঁরা দুজনে মিলে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষে ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিবাদে কলম ধরেছিলেন, যা তাঁর নির্ভীক চরিত্রের পরিচয় দেয়।

আইসিএস ও বিলেত যাত্রা 🚢

১৮৬২ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য ইংল্যান্ড পাড়ি দেন। সে সময়ের সামাজিক প্রতিকূলতা এবং বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। আইসিএস পরীক্ষায় সফল না হলেও তিনি ইংল্যান্ডের লিংকন’স্ ইন্ থেকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং ব্যারিস্টার হিসেবে ভারতে ফিরে আসেন।

আইন পেশা ও আদর্শ

কলকাতা হাইকোর্টে কর্মরত প্রথম ভারতীয় ব্যারিস্টার ছিলেন মনমোহন ঘোষ। আইনজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ এবং সাহসী। বিশেষ করে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের দুর্নীতির মুখোশ খুলে দেওয়া এবং নিরীহ ভারতীয়দের আইনি সুরক্ষা প্রদানে তিনি এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি আর্থিক সংকটে পড়া কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকেও নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেছিলেন।

নারীশিক্ষা ও সমাজ সংস্কার

মনমোহন ঘোষ বিশ্বাস করতেন সমাজকে উন্নত করতে হলে নারীদের শিক্ষিত করা অপরিহার্য। তিনি মেরি কার্পেন্টার এবং অ্যানেট অ্যাক্রয়েডের মতো বিদেশী সংস্কারকদের সাথে মিলে বাংলায় নারীশিক্ষা প্রসারে কাজ করেন। ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’‘বেথুন স্কুল’-এর একীকরণে তিনি প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। এছাড়া বাল্যবিবাহ রোধে এবং নারীদের সামাজিক অধিকার রক্ষায় তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন।

রাজনৈতিক অবদান ⚖️

  • ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা।
  • ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
  • বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করার দাবি।
  • ১৮৯০ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান।
  • স্বদেশের অবস্থা সম্পর্কে ইংল্যান্ডে গিয়ে বক্তৃতা প্রদান।

ব্যক্তিগত জীবনে পাশ্চাত্য রীতিনীতি পছন্দ করলেও তাঁর কর্মজীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে উৎসর্গীকৃত।

home3