Bangla Panjika 2026

রাজশেখর বসু (পরশুরাম): বাংলা সাহিত্যের ব্যঙ্গরসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রাজশেখর বসুর (মার্চ ১৬, ১৮৮০ – এপ্রিল ২৭, ১৯৬০) নাম বিশেষ সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি শুধু একজন সাহিত্যিকই নন, ছিলেন একাধারে অনুবাদক, রসায়নবিদ এবং বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিধান প্রণেতা। সাহিত্যজগতে তিনি সর্বাধিক পরিচিত তাঁর ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে। তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক ও অমলিন রসাত্মক গল্পগুলি বাংলা পাঠকের কাছে আজও সমান জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

রাজশেখর বসুর জন্ম ১৮৮০ সালের ১৬ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব বর্ধমান জেলার বামুনপাড়া গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে। তাঁর পিতা চন্দ্রশেখর বসু ছিলেন একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত এবং দ্বারভাঙ্গা রাজ এস্টেটের ম্যানেজার। ছোটবেলার একটি বড় অংশ দ্বারভাঙ্গাতে কাটানোর ফলে তিনি বাংলা ও হিন্দিতে সমান দক্ষতা অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯০০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়নে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও সাহিত্যের প্রতি তাঁর টান ছিল সহজাত।

বেঙ্গল কেমিক্যাল ও কর্মজীবন ✨

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আহ্বানে তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস-এ যোগদান করেন। একজন রসায়নবিদ হিসেবে শুরু করলেও নিজের মেধা ও সততার জোরে তিনি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে উন্নীত হন। শিল্প পরিচালনায় তাঁর দূরদর্শিতা ছিল অনন্য।

সাহিত্য ও ছদ্মনাম

১৯২২ সালে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে তাঁর ব্যঙ্গধর্মী রচনার মাধ্যমে সাহিত্যজগতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। তাঁর গল্পে সমাজের অসঙ্গতিগুলো ফুটে উঠত কৌতুক আর বুদ্ধিমত্তার মোড়কে। তিনি যেমন লিখেছেন কালজয়ী হাস্যরসের গল্প, তেমনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন রামায়ণ, মহাভারত ও মেঘদূতের মতো ধ্রুপদি সাহিত্য। তাঁর প্রণীত বাংলা অভিধান ‘চলন্তিকা’ আজও বাংলা ভাষা চর্চায় একটি অপরিহার্য নাম।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

সাহিত্য ও বিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হন:

  • ১৯৫৬ সালে লাভ করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
  • পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে প্রদান করে মর্যাদাপূর্ণ রবীন্দ্র পুরস্কার
  • ভারত সরকার তাঁকে দেশের উচ্চতর নাগরিক সম্মান পদ্মভূষণ-এ ভূষিত করে।
  • কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন জগত্তারিণী ও সরোজিনী পদক।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ 📚

  • গড্ডলিকা
  • কজ্জলী
  • হনুমানের স্বপ্ন
  • লঘুগুরু
  • বিচিন্তা
  • চলন্তিকা (অভিধান)
  • পরশ পাথর (গল্প)
  • ভারতের খনিজ

জীবনাবসান

ব্যক্তিগত জীবনে অনেক শোক সত্ত্বেও তিনি সাহিত্যসাধনা থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর জনপ্রিয় গল্প ‘পরশ পাথর’ ও ‘মহাপুরুষ’ অবলম্বনে সত‍্যজিৎ রায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ১৯৬০ সালের ২৭ এপ্রিল এই মহান সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর ‘পরশুরামী’ হাসি আজও বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে অম্লান।

home3