
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে যা চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে। জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ডান্ডি অভিযান ঠিক তেমনই এক অনন্য সাধারণ ঘটনা।
উপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এটি ছিল কেবল ব্রিটিশদের অন্যায় লবণ করের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে ছিল এক সুদূরপ্রসারী সংকল্প। এই অভিযানই ছিল সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা সারা ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এটি কেবল একটি পদযাত্রা ছিল না, এটি ছিল সাধারণ ভারতবাসীর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই।
পটভূমি: পূর্ণ স্বরাজের ডাক
১৯২৯ সালের শেষলগ্নে লাহোর অধিবেশনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ঘোষণা করে—ভারতের একমাত্র লক্ষ্য এখন ‘পূর্ণ স্বরাজ’ বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি দেশজুড়ে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। চারিদিকে মানুষের মনে এক প্রবল উদ্দীপনা—দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতেই হবে। এই আবহে গান্ধীজি বেছে নিলেন প্রতিবাদের এক অভিনব অস্ত্র: লবণ সত্যাগ্রহ।
লড়াইয়ের প্রস্তুতি ও ভাইসরয়কে চরমপত্র
পদযাত্রা শুরুর আগে ১৯৩০ সালের ২ মার্চ গান্ধীজি তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইনকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতের রুগ্ণ অর্থনীতির করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যদি সরকার দাবি না মানে, তবে তিনি প্রতীকি প্রতিবাদের মাধ্যমে লবণ আইন ভঙ্গ করবেন।
তাঁর ভাষায়, লবণ কর ছিল দরিদ্রতম মানুষের ওপর সবচাইতে বড় অবিচার। সেই চিঠির কোনো সদুত্তর না পেয়ে গান্ধীজি ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন— “আমি হাঁটু গেড়ে বসে রুটি চেয়েছিলাম, বিনিময়ে পেয়েছি পাথর।”
মহানিষ্ক্রমণের সেই দিনটি
১২ মার্চ, ১৯৩০: সকাল সাড়ে ৬টা। আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম থেকে শুরু হলো সেই মহাযাত্রা। ৬১ বছর বয়সী লড়াকু গান্ধীজি হাতে লাঠি নিয়ে এগিয়ে চললেন। সঙ্গে তাঁর বাছাই করা ৭৮ জন নির্ভীক সত্যাগ্রহী। এই ছোট্ট দলে ছিলেন বাংলার ছেলে থেকে বিহারের কৃষক, এমনকি নেপালের প্রতিনিধিও—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক অখণ্ড ভারতের প্রতিচ্ছবি।
রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন সেই দৃশ্য দেখার জন্য। গান্ধীজির অদম্য জেদ দেখে জওহরলাল নেহরু আবেগপূর্ণ কণ্ঠে বলেছিলেন— “আজ সেই তীর্থযাত্রী ধুলোমাখা পথ দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর চোখে উজ্জ্বল স্বপ্ন, আর অন্তরে এক মহান সংকল্পের আগুন।”
সত্যাগ্রহের কঠোর নিয়ম ও জনজোয়ার
দীর্ঘ ২৪১ মাইলের এই পথে গান্ধীজির প্রাণশক্তি সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। প্রতিদিন গড়ে ১০ মাইল হাঁটা, পথে পথে জনসভা করা আর মানুষের মনে সাহসের সঞ্চার করা ছিল তাঁর কাজ। তিনি বলতেন— “এটি কোনো সাধারণ যাত্রা নয়, এটি একটি পবিত্র তীর্থযাত্রা। আমাদের সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে।”
তিনি পথে পথে মানুষকে বিদেশি দ্রব্য বর্জন করতে এবং খাদি পরার শপথ নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। নারীদের প্রতি তাঁর বিশেষ আহ্বান ছিল—মদের দোকান ও বিদেশি কাপড়ের দোকানের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেওয়া।

ডান্ডি পৌঁছানো ও ইতিহাস সৃষ্টি
অবশেষে ৫ এপ্রিল ১৯৩০-এ গান্ধীজি ডান্ডি পৌঁছান। পরদিন ৬ এপ্রিল ভোরে প্রার্থনার পর তিনি সমুদ্রে স্নান সেরে এক মুঠো নোনা কাদা বা লবণ হাতে তুলে নেন। ঠিক সকাল ৮:৩০ মিনিটে প্রতীকীভাবে ভঙ্গ হলো ব্রিটিশদের অহংকারী লবণ আইন। সরোজিনী নাইডু এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁকে ‘আইন ভঙ্গকারী’ বলে অভিনন্দিত করেন।
আন্দোলনের বিস্তার ও বর্বর দমননীতি
ডান্ডির সেই এক মুঠো লবণ যেন সারা দেশে বিস্ফোরণ ঘটালো। লক্ষ লক্ষ মানুষ আইন অমান্য করে কারাবরণ করতে শুরু করলেন। ব্রিটিশ সরকারও চুপ করে বসে ছিল না; শুরু হলো অমানুষিক নির্যাতন। ‘ধরাসনা লবণ ডিপো’ অভিযানে পুলিশ যেভাবে সত্যাগ্রহীদের ওপর লাঠিচার্জ করেছিল, তার বিবরণ পড়ে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল। সাংবাদিক ওয়েব মিলার লিখেছিলেন যে, পুলিশ একের পর এক আঘাত করলেও সত্যাগ্রহীরা প্রতিবাদে একটি হাতও তোলেনি।
শেষ কথা: আগুনের পরশমণি
৪ মে রাতে গান্ধীজিকে গ্রেফতার করা হলেও ততক্ষণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ডান্ডি অভিযান প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের নৈতিক শক্তির কাছে কামান-বন্দুকের শক্তিও তুচ্ছ। এই আন্দোলনই ব্রিটিশ শাসনের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল এবং ভারতকে পৌঁছে দিয়েছিল স্বাধীনতার দোরগোড়ায়।
