
শক্তি চট্টোপাধ্যায় (২৫ নভেম্বর ১৯৩৩ – ২৩ মার্চ ১৯৯৫) ছিলেন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নাম—কবি, ঔপন্যাসিক, লেখক ও অনুবাদক হিসেবে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। জীবনানন্দ-উত্তর যুগের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত। বিশেষত ষাটের দশকে বাংলা কবিতার যে নতুন ধারা গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রে তিনি ছিলেন এবং হাংরি আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবেও সাহিত্যজগতে বিশেষভাবে আলোচিত হন।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা 🏡
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগরে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া শক্তির শৈশব খুব সহজ ছিল না। ছোটবেলাতেই পিতৃহীন হয়ে তিনি পিতামহের তত্ত্বাবধানে বড় হন। পরবর্তীতে কলকাতায় এসে বাগবাজারের মহারাজা কাশিম বাজার পলিটেকনিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এখানেই তাঁর ছাত্রজীবনে মার্কসবাদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে।
ছাত্রাবস্থায় ১৯৪৯ সালে তিনি প্রগতি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন এবং “প্রগতি” নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যা পরে বহ্নিশিখা নামে পরিচিতি পায়। শিক্ষাজীবনে সিটি কলেজ ও প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক টানাপড়েন ও নানা বাধার কারণে তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেননি।
কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা 💼
জীবিকার প্রয়োজনে তাকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়—ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানে সহকারী, টিউটোরিয়াল হোমে শিক্ষকতা, এমনকি ব্যবসার উদ্যোগও নেন। কিন্তু কোনও কাজেই দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারেননি। পরে তিনি **সাংবাদিকতা পেশায়** যুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কলকাতার **আনন্দবাজার পত্রিকায়** কাজ করেন।
হাংরি আন্দোলন ও কবিতা প্রকাশ 💡
বাংলা সাহিত্যজগতে পরিবর্তনের হাওয়া নিয়ে যে **হাংরি আন্দোলন** শুরু হয়, তার প্রতিষ্ঠাতা চারজনের একজন ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। পরে মতভেদের কারণে তিনি আন্দোলন থেকে সরে এসে **কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে** যোগ দেন। মার্চ ১৯৫৬ সালে তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় **“যম”** নামে, বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত *কবিতা* পত্রিকায়।
সাহিত্যজীবন ও সৃষ্টিকর্ম 🖋️
তাঁর সাহিত্যজীবনের একটি বড় অধ্যায় হলো চাইবাসার বনাঞ্চলে বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে কাটানো সময়। এখানেই তিনি এক **অসাধারণ লিরিকাল কবি** হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন। একই দিনে একাধিক কবিতা রচনার অভ্যাস ছিল তাঁর। **রূপচাঁদ পক্ষী** নামে বিভিন্ন ফিচারও লিখেছেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাস 📚
- কাব্যগ্রন্থ: ধর্মে আছো, জিরাফেও আছো
- কাব্যগ্রন্থ: সোনার মাছি খুন করেছি
- কাব্যগ্রন্থ: হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান
- কাব্যগ্রন্থ: যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো (সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত)
- উপন্যাস: অবনী বাড়ি আছো?
- উপন্যাস: দাঁড়াবার জায়গা
পুরস্কার ও সম্মাননা 🏆
শক্তি চট্টোপাধ্যায় বাংলা কবিতাকে নতুন মাত্রা দেওয়ার জন্য বহু পুরস্কারে সম্মানিত হন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ **যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো** বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এর জন্য তিনি:
- **সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার** লাভ করেন।
- এছাড়া **আনন্দ পুরস্কারের** মতো সম্মানেও তিনি ভূষিত হন।
