Bangla Panjika 2026

ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ: সংগ্রামী রানি ও স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা

সংক্ষিপ্ত পরিচয় : রানি লক্ষ্মীবাঈ ( ১৯ নভেম্বর, ১৮২৮ – ১৭ জুন ১৮৫৮ ) ছিলেন ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের অন্যতম সাহসী ও প্রভাবশালী নেতা। স্বত্ববিলোপ নীতি-র কারণে ঝাঁসি ব্রিটিশদের দখলে গেলে তিনি নিজেই রাজ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে অংশ নেন এবং শেষ পর্যন্ত গ্বালিয়রের যুদ্ধে লড়তে লড়তেই শহীদ হন। স্বাধীনতা-পূর্ব থেকেই তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীক।

শৈশব, বিবাহ ও উত্তরাধিকার

মানিকর্ণিকা তাম্বে (মণু) জন্মগ্রহণ করেন বারাণসীতে এক মারাঠি পরিবারে। মা মারা যাওয়ার পর তাঁর বাবা মোরোপন্ত তাম্বে তাঁকে নিয়ে পেশোয়া বাজি রাও-এর দরবারে চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই মণু ঘোড়ায় চড়া, তলোয়ার চালনা ও বন্দুক চালানো শিখেছিলেন। অল্প বয়সে তিনি ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ‘রানি লক্ষ্মীবাঈ’ নাম গ্রহণ করেন। তাঁদের দত্তক পুত্র ছিলেন দামোদর রাও।

ব্রিটিশ দখল ও বিদ্রোহের সূচনা

১৮৫৩ সালে রাজার মৃত্যুর পর লর্ড ডালহৌজি ‘স্বত্ববিলোপ নীতি’ (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করে দত্তক পুত্রের অধিকার অস্বীকার করেন এবং ঝাঁসি ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়। রানি ব্রিটিশদের কাছে প্রতিবাদ জানালেও তা গৃহীত হয়নি। এই সময় তিনি ঘোষণা করেন— “আমি আমার ঝাঁসি ছেড়ে দেব না।”

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হলে, ঝাঁসিতেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। রানি নিজেকে ঝাঁসির শাসক ঘোষণা করেন এবং নিজের রাজ্য রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী তৈরি করে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর আক্রমণও প্রতিহত করেন।

শেষ লড়াই ও শাহাদাত

১৮৫৮ সালের শুরুতে মেজর জেনারেল হিউ রোজের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁসি আক্রমণ করে। তীব্র অবরোধের পর, রানি লক্ষ্মীবাঈ তাঁর দত্তক পুত্রকে কোমরে বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে অবিশ্বাস্য সাহসে দুর্গ থেকে পালিয়ে যান। তিনি কালপী এবং তারপর গ্বালিয়রের দিকে অগ্রসর হন এবং বিদ্রোহী নেতা তাত্যা টোপের সাথে যোগ দেন।

১৮ জুন ১৮৫৮, গ্বালিয়রের নিকট কোটাহ-কি-সেরাই অঞ্চলে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং লড়তে লড়তেই শহীদ হন। ব্রিটিশ জেনারেল হিউ রোজ তাঁকে “সব বিদ্রোহীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বাধিক সাহসী” বলে উল্লেখ করেছিলেন।

সাংস্কৃতিক ও জাতীয়তাবাদী প্রতীক

রানি লক্ষ্মীবাঈ খুব দ্রুতই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হন। “ঝাঁসি কি রানি” কবিতা এবং বৃন্দাবনলাল বর্মার উপন্যাসের মাধ্যমে তাঁর বীরত্ব অমর হয়ে আছে। সুভাষ চন্দ্র বসুর গঠিত নারী বাহিনীর নাম ছিল “ঝাঁসি রানি রেজিমেন্ট”, যা স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর প্রভাবকে তুলে ধরে। তিনি নারী-শক্তি ও জাতীয় গৌরবের এক অবিনশ্বর প্রতীক।


ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ শুধু একটি নাম নয়—তিনি একসঙ্গে স্বাধীনতা, প্রতিবাদ, নারীর শক্তি ও অবিনশ্বর জাতীয় গৌরবের প্রতীক।

home3