
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (The Great War) মানব ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক সংঘাত। এটি ১৯১৪ সালের ২৮শে জুলাই শুরু হয়েছিল এবং ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল। এই যুদ্ধ বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিয়েছে।
যুদ্ধের কারণসমূহ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল কারণগুলো ছিল বহুমুখী এবং জটিল:
- জাতীয়তাবাদ: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র জাতীয়তাবাদী অনুভূতি বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা প্রায়শই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাতের জন্ম দিত।
- সাম্রাজ্যবাদ: উপনিবেশ বিস্তারের জন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। কাঁচামাল এবং বাজারের দখল নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়শই উত্তেজনা সৃষ্টি হতো।
- সামরিকবাদ: ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছিল, যা যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে।
- জোট ব্যবস্থা: ইউরোপীয় দেশগুলো দুটি প্রধান সামরিক জোটে বিভক্ত ছিল:
- ট্রিপল এন্টেন্ট (Triple Entente): ফ্রান্স, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্য।
- ট্রিপল অ্যালায়েন্স (Triple Alliance): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং ইতালি (যদিও ইতালি পরে পক্ষ পরিবর্তন করে)।
- তাৎক্ষণিক কারণ: ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন সার্বিয়ার এক জাতীয়তাবাদী ছাত্র কর্তৃক অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিন্যান্ডের হত্যাকাণ্ড ছিল যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা দ্রুত অন্যান্য জোটবদ্ধ দেশগুলোকে যুদ্ধে টেনে আনে।

যুদ্ধের প্রধান পক্ষসমূহ
- কেন্দ্রীয় শক্তি (Central Powers): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য এবং বুলগেরিয়া।
- মিত্রশক্তি (Allied Powers): ফ্রান্স, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, রাশিয়া, ইতালি (১৯১৫ থেকে), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৯১৭ থেকে) এবং অন্যান্য সহযোগী দেশ।
যুদ্ধের ফলাফল
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী:
- ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ: আনুমানিক ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল, যার মধ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ সামরিক কর্মী এবং ৬০ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক।
- সাম্রাজ্যের পতন: অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান এবং রুশ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
- নতুন দেশের জন্ম: অনেক নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়, যেমন পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া ইত্যাদি।
- জাতিসংঘের সৃষ্টি: ভবিষ্যতে এমন যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, লিগ অফ নেশনস (জাতিসংঘের পূর্বসূরি), গঠিত হয়।
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ: জার্মানির উপর আরোপিত কঠোর শর্তাবলী এবং প্রতিশোধের অনুভূতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
