
ডঃ বিক্রম আম্বালাল সারাভাই (১২ অগাস্ট ১৯১৯ – ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭) ছিলেন একজন প্রথিতযশা ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান নির্মাতা। তাঁকে শ্রদ্ধাভরে “ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির জনক” বলা হয়। বিজ্ঞানকে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তারই বাস্তব রূপ আজকের ভারতের মহাকাশ সাফল্য।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
ডঃ বিক্রম সারাভাই জন্মগ্রহণ করেন গুজরাটের আহমেদাবাদের এক সমৃদ্ধ ও সংস্কৃতিবান পরিবারে। তাঁর পিতা অম্বালাল সারাভাই ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও বিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। আহমেদাবাদের পারিবারিক বিদ্যালয় ‘রিট্রিট’-এ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান।
গবেষণা ও দীক্ষা ✨
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে ফিরে এসে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (IISc)-এ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি. ভি. রামণ-এর তত্ত্বাবধানে মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Ray) নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
মহাকাশ বিজ্ঞানে বিপ্লব ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
ভারতকে আধুনিক বিজ্ঞানের মানচিত্রে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ডঃ সারাভাই একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা ও দর্শনের ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তীকালে ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’ উৎক্ষেপিত হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিষ্ঠান হলো:
- ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (PRL)
- ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (IIM-A)
- ইসরো (ISRO) – তৎকালীন INCOSPAR
- থুম্বা রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (TERLS)
- কমিউনিটি সায়েন্স সেন্টার
- সারাভাই ফাউণ্ডেশন
দর্শন ও আদর্শ
ডঃ সারাভাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, মহাকাশ প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যা সমাধান করা। তাঁর মতে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং কৃষি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও জাতীয় উন্নয়নের কাজে মহাকাশ বিজ্ঞানকে ব্যবহার করাই ভারতের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ব্যক্তিগত জীবন ও স্বীকৃতি
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মৃণালিনী সারাভাই-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর পারিবারিক পরিবেশে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও সারোজিনী নাইডুর মতো মহান ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শ তাঁকে মানবতাবাদী ও জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত করে। বিজ্ঞান ও সমাজে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ এবং মরণোত্তর পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।
অমর স্মৃতি 🚀
তাঁর স্মৃতিতে তিরুভনন্তপুরমে স্থাপিত হয়েছে Vikram Sarabhai Space Centre, এবং চাঁদের একটি ক্রেটারের নামকরণ করা হয়েছে ‘সারাভাই ক্রেটার’।
উপসংহার
ডঃ বিক্রম আম্বালাল সারাভাই ছিলেন কেবল একজন বিজ্ঞানী নন—তিনি ছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা জাতি-নির্মাতা। তাঁর দেখানো পথেই ভারত আজ মহাকাশ বিজ্ঞানের বিশ্বমঞ্চে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
