Bangla Panjika 2026

স্বামী বিবেকানন্দ: বেদান্ত ও যোগ দর্শন প্রচারের অন্যতম পথিকৃৎ

স্বামী বিবেকানন্দ “জন্মনাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত” (১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ – ৪ জুলাই ১৯০২) ছিলেন একজন প্রখ্যাত ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক এবং ধর্মীয় শিক্ষক। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত যোগী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য এবং পাশ্চাত্য জগতে বেদান্ত ও যোগ দর্শন প্রচারের অন্যতম পথিকৃৎ।

১. প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার প্রেক্ষাপট

১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি মকর সংক্রান্তির পুণ্যতিথিতে কলকাতার শিমুলিয়া অঞ্চলের এক অভিজাত দত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন কলকাতা উচ্চ আদালতের এক সফল ও যুক্তিবাদী আইনজীবী। অন্যদিকে মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও অসীম ধৈর্যশীল নারী। শৈশবে অত্যন্ত দুরন্ত হওয়ার কারণে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘বীরেশ্বর’, যা পরে ‘নরেন্দ্রনাথ’-এ রূপান্তরিত হয়।

নরেন্দ্রনাথের শিক্ষা জীবন ছিল অসাধারণ। স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় তিনি কেবল পাঠ্যবই নয়, বরং পাশ্চাত্য দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইউরোপীয় ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বিশেষ করে ডেভিড হিউম, কান্ট এবং হার্বার্ট স্পেন্সারের বিবর্তনবাদ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর অসামান্য স্মরণশক্তির কারণে শিক্ষক ও সহপাঠীরা তাঁকে ‘শ্রুতিধর’ বলতেন। এই সময়েই তিনি ‘ব্রাহ্ম সমাজ’-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিরাকার ঈশ্বরের সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

২. শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্য ও আধ্যাত্মিক রূপান্তর

নরেন্দ্রনাথের মনে একটাই চিরন্তন প্রশ্ন ছিল— “আপনি কি ঈশ্বর দেখেছেন?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ১৮৮১ সালে তিনি দক্ষিণেশ্বরের সাধক শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সেই অমোঘ উত্তর— “হ্যাঁ দেখেছি, যেমন তোকে দেখছি, তার চেয়েও স্পষ্টভাবে”— নরেন্দ্রনাথের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

১৮৮৪ সালে পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। এই কঠিন সময়েই তিনি আধ্যাত্মিকতার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেন। গুরুর নির্দেশে তিনি মা কালীর কাছে পার্থিব সুখ না চেয়ে জ্ঞান, ভক্তি ও বৈরাগ্য প্রার্থনা করেন। ১৮৮৬ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের পর, বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাইদের নিয়ে বরাহনগরে ভারতের প্রথম রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপন করেন এবং সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন।

শিকাগো বিজয় ও ‘সাইক্লোনিক মঙ্ক’ ✨

১৮৯৩ সালে শিকাগোতে আয়োজিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর ভাষণের শুরুতেই যখন তিনি “আমেরিকার ভাই ও বোনেরা” বলে সম্বোধন করেন, তখন পুরো হলঘর কয়েক মিনিট করতালিতে ফেটে পড়ে। পাশ্চাত্য সংবাদমাধ্যম তাঁকে ‘সাইক্লোনিক মঙ্ক’ বা ‘ঝড় তোলা সন্ন্যাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।

৩. পরিব্রাজক জীবন ও দর্শন

সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি পায়ে হেঁটে সারা ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত ভ্রমণের সময় তিনি সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট নিজের চোখে দেখেন। কন্যাকুমারীর সমুদ্রতীরের শিলাখণ্ডে তিন দিন ধ্যানমগ্ন থেকে তিনি ভারতের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেন।

বিবেকানন্দের দর্শন ছিল অত্যন্ত ব্যবহারিক। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম কেবল মন্দিরে বা পুঁথিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। তিনি প্রচার করেন:

  • নব্য-বেদান্ত: যেখানে তিনি অদ্বৈত বেদান্তের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটান।
  • চার যোগ: ঈশ্বর লাভের চারটি পথ— কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, রাজযোগ ও জ্ঞানযোগ।
  • মানব সেবা: তাঁর মূল মন্ত্র ছিল— “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।”

৪. প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্য কর্ম 📚

তিনি আর্তের সেবা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার প্রসারে বেশ কিছু কালজয়ী প্রতিষ্ঠান ও সাহিত্য রচনা করেন:

  • রামকৃষ্ণ মিশন (১৮৯৭): আর্তের সেবা ও জনশিক্ষা প্রসারে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সংস্থা.
  • বেলুর মঠ: রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয়।
  • বেদান্ত সোসাইটি: পাশ্চাত্য সমাজে ভারতীয় দর্শন পৌঁছে দেওয়ার কেন্দ্র।
  • রাজযোগ
  • কর্মযোগ
  • জ্ঞানযোগ
  • ভক্তিযোগ
  • বর্তমান ভারত
  • পরিব্রাজক

৫. জাতীয়তাবাদ ও মহাপ্রয়াণ

বিবেকানন্দ ছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদের প্রধান অনুপ্রেরণা। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং অরবিন্দ ঘোষ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর দেশপ্রেমের প্রতি সম্মান জানাতেই তাঁর জন্মদিনটি ভারতে ‘জাতীয় যুব দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।

১৯০২ সালের ৪ জুলাই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে হাওড়ার বেলুর মঠে তিনি মহাসমাধি লাভ করেন। তাঁর দেহত্যাগ ঘটলেও তাঁর সেই বজ্রবাণী আজও আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হয়:

“উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত”

— ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত থেমো না।

home3