
শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ (১৫ অগস্ট ১৮৭২ – ৫ ডিসেম্বর ১৯৫০) ছিলেন ভারতীয় চিন্তাধারার এক অসাধারণ দিকপাল—**দার্শনিক, যোগী, কবি, সাহিত্যিক এবং জাতীয়তাবাদী নেতা**। জীবনযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি যেমন স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনই পরবর্তী জীবনে মানব-আত্মার বিবর্তন নিয়ে এক নবদর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ভাবনা, সাধনা এবং রচনা আজও মানবচেতনার বিকাশে অনুপ্রেরণা জোগায়।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
কলকাতায় জন্ম নেওয়া অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন এক সাংস্কৃতিক ও বিদ্যাবত্তায় সমৃদ্ধ পরিবারের সদস্য। তাঁর বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা ছিলেন সমাজ সংস্কারক **রাজনারায়ণ বসুর কন্যা**। খুব অল্প বয়সেই তাঁকে ভারতীয় পরিবেশ থেকে দূরে রেখে ইংরেজি প্রভাবে বড় করে তোলা হয়। ফলে শৈশবেই দার্জিলিং ও পরবর্তীতে **ইংল্যান্ডে** তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়।
ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার, সেন্ট পলস স্কুল ও পরবর্তীতে **কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং’স কলেজে** তিনি গ্রীক, লাতিন, সাহিত্য এবং নানা পাশ্চাত্য বিদ্যাশিক্ষায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তাঁর অসাধারণ মেধার কারণে তিনি **ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় কৃতিত্ব দেখালেও** পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান।
দেশে ফিরে জাতীয়তাবাদী জাগরণ
ভারতে ফিরে অরবিন্দ **বারোদা রাজ্যে** প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দেশপ্রেমের তীব্র উন্মেষ। তিনি বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন, গোপনে সংগঠন গড়ে তোলেন এবং স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ তরুণ নেতাদের সঙ্গে একত্রে কাজ করেন।
- তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন এবং **’বন্দে মাতরম্’**-এর মতো জাগরণধর্মী সংবাদপত্র সম্পাদনা করেন।
- স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে **আলিপুর বোমা মামলা** তাঁকে জড়িয়ে ফেলে।
- দীর্ঘ বিচার ও **কারাবাসের সময়** তিনি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক গভীর অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যা তাঁর জীবনের সম্পূর্ণ গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়।
আধ্যাত্মিক পথের সূচনা ও যোগ সমন্বয়
মুক্তির পর তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি উপনিবেশ **পন্ডিচেরিতে** চলে যান। এখানেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় তাঁর অনন্য সাধনাপদ্ধতি—**’যোগ সমন্বয়’ (Integral Yoga)**, যা মানবচেতনাকে রূপান্তরের মাধ্যমে পৃথিবীতে এক দিব্যজীবন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্দেশ করে।
🧘 যোগ সমন্বয়ের মূল ধারণা
শ্রীঅরবিন্দের মতে, মানবজীবনের বিবর্তন শেষ হয় না শুধুই মোক্ষলাভে; বরং মানুষের অন্তঃপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে **পৃথিবীতেই দিব্য অস্তিত্বে পরিণত হওয়া সম্ভব**। এই প্রক্রিয়াকে তিনি **’অতিমানস’ (Supermind)** নাম দিয়েছেন।
তাঁর আধ্যাত্মিক সহচর **মীরা আলফাসা**—যিনি পরবর্তীতে **শ্রীমা** নামে পরিচিত—তাঁর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন **শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম**, যা আজ এক বিশ্বমানের সাধনাকেন্দ্র।
সাহিত্য, দর্শন ও রচনা
শ্রীঅরবিন্দ ছিলেন এক অসামান্য সাহিত্যিক ও দার্শনিক। তাঁর রচনায় আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিবর্তন, যোগসাধনার পথ এবং মানবজাগরণের বার্তা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর প্রধান রচনাগুলো ভারতীয় দর্শন, জাতীয়তাবাদ এবং আধ্যাত্মিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তাঁর প্রধান গ্রন্থসমূহ
- The Life Divine
- The Synthesis of Yoga
- Savitri: A Legend and a Symbol (মহাকাব্য)
- Essays on the Gita
- A System of National Education
- The Renaissance in India
- কারাকাহিনী (বাংলা)
- ধর্ম ও জাতীয়তা (বাংলা)
সমাপনী কথা
শ্রীঅরবিন্দের জীবন এক বিস্ময়কর যাত্রা—রাজনৈতিক সংগ্রাম থেকে গভীর আধ্যাত্মিক তপস্যা, আর ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে মানবসভ্যতার সামগ্রিক বিবর্তনের মহাদর্শন। তিনি শুধু একজন চিন্তাবিদ নন; তিনি একজন **যুগনির্মাতা**, যাঁর ভাবনা আজও মানবজাতিকে নতুন সম্ভাবনার পথে অনুপ্রাণিত করে।
