
পণ্ডিত রবিশঙ্কর (৭ এপ্রিল ১৯২০ — ১১ ডিসেম্বর ২০১২) ছিলেন একজন বিশ্বখ্যাত ভারতীয় সেতারবাদক, সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন এবং পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে তার সুন্দর মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তার ছয় দশকেরও বেশি সঙ্গীতজীবন भारतीय সঙ্গীতের এক অমূল্য অধ্যায়।
শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন
রবিশঙ্করের পুরো নাম ছিল রবীন্দ্র শঙ্কর চৌধুরী। আদি পৈতৃক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের নড়াইল জেলায়, কিন্তু তিনি জন্মগ্রহণ করেন বারাণসীতে। তিনি ছিলেন পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। তার বাবা শ্যাম শঙ্কর চৌধুরী ছিলেন একজন বিখ্যাত আইনজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবী, কিন্তু বাবার অনুপস্থিতিতে তার মা হেমাঙ্গিনী দেবীর কাছেই তিনি বড় হন।
তার বড় ভাই উদয় শঙ্কর ছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। ১৯৩০ সালে মায়ের সঙ্গে প্যারিসে গিয়ে রবিশঙ্কর বড় ভাইয়ের নাচের দলে যোগ দেন। সেখানে তিনি স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং বারো বছর বয়স থেকেই নাচ ও সেতার বাজিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেন।
সঙ্গীত শিক্ষা
১৯৩৮ সালে, আঠারো বছর বয়সে তিনি নাচ ছেড়ে দিয়ে মাইহার ঘরানার প্রবাদপ্রতিম গুরু উস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের কাছে সেতার শেখা শুরু করেন। প্রায় সাত বছর (১৯৩৮-১৯৪৪) কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি সেতারের উচ্চতম শিক্ষা লাভ করেন। এ সময় তিনি গুরুর ছেলে উস্তাদ আলী আকবর খান (সরোদবাদক)-এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে তাদের যুগলবন্দী অনেক স্মরণীয় হয়ে ওঠে।
পারিবারিক জীবন
১৯৪১ সালে তিনি গুরু আলাউদ্দিন খানের মেয়ে অন্নপূর্ণা দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের এক ছেলে শুভেন্দ্র শঙ্কর (শুভো) জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীকালে গ্রাফিক শিল্পী ও সুরকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন (তিনি ১৯৯২ সালে মারা যান)। এই বিয়ে পরে বিচ্ছেদে শেষ হয়।
পরবর্তীকালে আমেরিকান কনসার্ট প্রযোজক স্যু জোন্সের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে জন্ম নেয় কন্যা নোরা জোন্স, যিনি বিশ্ববিখ্যাত জ্যাজ ও পপ শিল্পী এবং একাধিক গ্র্যামি বিজয়ী। তার তৃতীয় স্ত্রী সুকন্যা শঙ্কর-এর সঙ্গে তার আরেক কন্যা অনুশকা শঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন। অনুশকা বাবার কাছ থেকে সেতার শিখে নিজেও একজন প্রতিষ্ঠিত সেতারবাদক হয়ে উঠেছেন।
সঙ্গীত জীবন ও অবদান
১৯৩৯ সালে আহমেদাবাদে তিনি প্রথম একক সেতার পরিবেশন করেন। ১৯৪০-এর দশক থেকেই তিনি ভারতে সেতারবাদক হিসেবে স্বীকৃতি পান। তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন এবং বৈদ্য বৃন্দ চেম্বার অর্কেস্ট্রা প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি সত্যজিৎ রায়ের অপু ত্রয়ী (পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার)-এর সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এছাড়া নীচা নগর, গান্ধী, চার্লিসহ অনেক চলচ্চিত্রে সুরারোপ করেছেন। কবি ইকবালের “সারে জাহাঁ সে আচ্ছা” গানটিকে তিনি অমর সুরে সুরারোপ করেন।
১৯৬০-এর দশকে তিনি পাশ্চাত্যে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দূত হয়ে ওঠেন। বিটলস-এর জর্জ হ্যারিসন তার সেতার শিক্ষক ও বন্ধু হন। তিনি মন্টেরি পপ ফেস্টিভ্যাল, উডস্টক ফেস্টিভ্যালসহ বিভিন্ন বড় অনুষ্ঠানে সেতার বাজান। ১৯৭১ সালে “কনসার্ট ফর বাংলাদেশ”-এ অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ে সাহায্য করেন।
তিনি বিখ্যাত বেহালাবাদক ইহুদি মেনুহিন, ফিলিপ গ্লাস, জ্যঁ-পিয়ের রামপালসহ অনেক পাশ্চাত্য শিল্পীর সঙ্গে যৌথ সঙ্গীত রচনা করেন। তার “প্যাসেজেস” অ্যালবাম ফিলিপ গ্লাসের সঙ্গে এক উল্লেখযোগ্য কাজ।
পুরস্কার ও সম্মান
- ভারতরত্ন (১৯৯৯) — ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান
- পদ্মবিভূষণ (১৯৮১) ও পদ্মভূষণ (১৯৬৭)
- একাধিক গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড (West Meets East, Concert for Bangladesh ইত্যাদি)
- ফ্রান্সের লিজিয়ন অব অনার, অনারারি নাইটহুড (ব্রিটেন), পোলার মিউজিক প্রাইজ, রামন মাগসেসে পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মান
- তিনি কিন্নর স্কুল অব মিউজিক (মুম্বই ও লস অ্যাঞ্জেলেস) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সারা বিশ্বে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রচার করেন।
জীবনাবসান
২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর ৯২ বছর বয়সে স্যান ডিয়েগোতে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি শ্রোতাদের সামনে সেতার বাজিয়েছিলেন। পণ্ডিত রবিশঙ্কর শুধু একজন সেতারবাদক ছিলেন না — তিনি ছিলেন সঙ্গীতের এক অমর দূত, যিনি পূর্ব ও পশ্চিমের সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিশ্বকে এক করেছিলেন। তার সুর আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে বেজে চলেছে।
“সঙ্গীত ভাষার চেয়েও শক্তিশালী — এটি সরাসরি আত্মার সঙ্গে কথা বলে।” — পণ্ডিত রবিশঙ্কর
