
প্রফুল্ল চাকী (১০ ডিসেম্বর ১৮৮৮ – ২ মে ১৯০৮) ছিলেন পূর্ববঙ্গের এক তরুণ বিপ্লবী— ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ, দুর্ধর্ষ ও আত্মত্যাগী বিপ্লবী হিসেবে স্মরণীয়। অগ্নিযুগের সশস্ত্র সংগ্রামে তিনি সাহসিকতা প্রদর্শন করে এবং নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মাত্র সাড়ে উনিশ বছর বয়সে তার আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকল।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষাজীবন
প্রফুল্ল চাকীর জন্ম বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে। ছোটবেলায় তাকে ভর্তি করা হয় বগুড়ার নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ স্কুলে এবং পরে মাইনর স্কুলে। ১৯০২ সালে তিনি রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ব্রিটিশ সরকারের কুখ্যাত ‘কার্লাইল সার্কুলার’-এর বিরুদ্ধে ছাত্রআন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে তাঁকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পরে তিনি রংপুরের ন্যাশনাল স্কুল এবং কৈলাস রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়-এ পড়েন। এখানেই জিতেন্দ্রনারায়ণ রায়, অবিনাশ চক্রবর্তী ও ঈশানচন্দ্র চক্রবর্তীর মতো বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসে তিনি বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত হন। একই সময়ে স্বামী বিবেকানন্দের রচনা, গীতা ও দেশপ্রেমমূলক সাহিত্য তাঁর মননে বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দেয়।
বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যোগদান
১৯০৬ সালে বিখ্যাত বিপ্লবী বারীন্দ্রনাথ ঘোষ রংপুর সফরে এসে প্রফুল্লের প্রতিভা ও দৃঢ়তা দেখে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান। সেখানেই তিনি যুগান্তর দলে যোগ দেন। প্রথম দায়িত্ব ছিল পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলার-কে হত্যা করার পরিকল্পনা—যদিও তা ব্যর্থ হয়, তবে প্রফুল্লর দৃঢ়তা ও সাহস বিপ্লবীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিংসফোর্ডকে লক্ষ্যবস্তু করা
কিংসফোর্ড কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে কিশোর রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর কঠোর বেত্রাঘাত ও নিষ্ঠুর শাস্তির জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তাঁর অত্যাচারের প্রতিবাদে বিপ্লবীরা তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। পরে যখন কিংসফোর্ডকে মুজাফফরপুরে বদলি করা হয়, সেখানে হত্যার নতুন পরিকল্পনা করা হয় এবং দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুকে।
মুজাফফরপুর বোমা অভিযান
দুই বিপ্লবী দিনের পর দিন কিংসফোর্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ইউরোপিয়ান ক্লাবের গেটের সামনে তাঁরা ওত পেতে থাকেন। একটি ঘোড়ার গাড়ি আসতে দেখে তাঁরা সেটিকে কিংসফোর্ডের গাড়ি মনে করে বোমা নিক্ষেপ করেন—কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, বরং ব্যারিস্টার প্রিংগল কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা নিহত হন। এরপর “প্রফুল্ল ও ক্ষুদিরাম” দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
পলায়ন, আত্মাহুতি ও ইতিহাসের সংগ্রাম
পরিকল্পনা অনুযায়ী দু’জন আলাদা পথে পলায়ন করেন। প্রফুল্ল ছদ্মবেশে ট্রেনে কলকাতার দিকে রওনা দেন। ২ মে ১৯০৮ তারিখে মোকামা স্টেশনে পুলিশ দারোগা নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে সন্দেহ করে ধাওয়া করেন। কোণঠাসা হয়ে পড়ে প্রফুল্ল গ্রেফতারের অপমান এড়াতে নিজের পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন—এমনটাই সরকারি নথিতে উল্লেখ। তবে ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে হত্যা করে মাথা কেটে নেয়, যাতে ক্ষুদিরামকে দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
এই নির্মমতার প্রতিশোধ হিসাবে পরবর্তীকালে বিপ্লবী রণেন গঙ্গোপাধ্যায় ও শ্রীশচন্দ্র পাল নন্দলালকে হত্যা করেন।
সমাপন
মাত্র সাড়ে উনিশ বছরের জীবনে প্রফুল্ল চাকী যে অভূতপূর্ব সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের উদাহরণ রেখে গেছেন, তা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। অগ্নিযুগের তরুণ প্রজন্ম তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়—প্রফুল্ল চাকীর জীবন আজও সাহস, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার এক অমর প্রতীক।