Bangla Panjika 2026

মহাত্মা গান্ধী: স্বাধীনতা, সত্যাগ্রহ ও অহিংসার অমর পথপ্রদর্শক

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী— (২ অক্টোবর ১৮৬৯ – ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮) বিশ্ব ইতিহাসে “মহাত্মা” নামে পরিচিত এই মানুষটি ছিলেন সত্য, অহিংসা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরে জন্ম নেওয়া গান্ধী ছোটবেলা থেকেই সাধারণ জীবনযাপন, নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির পথে শিক্ষিত হন। তাঁর বাবা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন স্থানীয় রাজ্যের দিওয়ান এবং মা পুতলিবাই ছিলেন ধর্মভীরু ও সহনশীল এক নারী, যার প্রভাব গান্ধীর চরিত্র নির্মাণে গভীর ছাপ ফেলে।

শিক্ষাজীবন ও দক্ষিণ আফ্রিকা

গান্ধীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় রাজকোটে, পরে তিনি আইন পড়ার উদ্দেশ্যে লন্ডনে যান। সেখানে তিনি পাশ্চাত্য দুনিয়ার শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও স্বাধীনচিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন। তবে তাঁর জীবনের বড় পরিবর্তন আসে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে। সেখানকার বর্ণবৈষম্য, ভারতীয়দের উপর অবিচার এবং শ্বেত-শাসকদের নির্মমতা তাঁকে আন্দোলনের পথে নিয়ে আসে। এখানেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত সত্যাগ্রহ—অত্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য, নৈতিকতা ও অহিংসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সংগ্রাম করার ধারণা।

জীবন দর্শন ও তিন মূলনীতি ✨

গান্ধীর জীবন দর্শন তিনটি মূলনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল— সত্য, প্রেম ও আত্মত্যাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা মানবিক কর্তব্য, তবে সেটি করতে হবে ঘৃণা ছাড়াই। তাঁর মতে, “অহিংসাই সবচেয়ে বড় শক্তি, কারণ এটি দুর্বলের নয়, শক্তিশালীর অস্ত্র।”

ভারতের স্বাধীনতা ও জনআন্দোলন

১৯১৫ সালে ভারত ফিরে এসে গান্ধী জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলনে নতুন প্রাণ আনেন। তিনি সাধারণ মানুষকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তাঁর নেতৃত্বে চাষি, শ্রমিক, মহিলা, ছাত্র—সমস্ত শ্রেণির মানুষ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে যুক্ত হন।

  • চাম্পারন আন্দোলন
  • খেলাফত আন্দোলন
  • অসহযোগ আন্দোলন
  • নমক সত্যাগ্রহ (লবণ সত্যাগ্রহ)
  • ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন
  • স্বনির্ভর অর্থনীতি (চরকা ও সুতা কাটা)

অনন্য চিন্তাধারা ও বিশ্ব প্রভাব

সরল খোলামেলা জীবন, হাতচাকা দিয়ে সুতা কাটা এবং গ্রামোন্নয়নের ধারণা তাঁর চিন্তাধারাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর চিন্তাধারা কেবল ভারত নয়, পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করেছে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র থেকে শুরু করে নেলসন ম্যান্ডেলা পর্যন্ত বহু নেতা তাঁর দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত। তাঁর বিখ্যাত বাণী— “নিজের পরিবর্তন দিয়েই বিশ্বকে বদলে দাও।”

মহাপ্রয়াণ ও উত্তরাধিকার

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান। কিন্তু তাঁর ভাবনা, আদর্শ ও মানবিকতার বার্তা আজও অম্লান। স্বাধীন ভারতের জন্মের পেছনে যেমন তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়, তেমনই মানবসভ্যতার ইতিহাসে তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৈতিক দিশারি। মহাত্মা গান্ধী প্রমাণ করেছেন—হৃদয়ে সত্য থাকলে, নিরস্ত্র মানুষের শক্তিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি।

home3