Bangla Panjika 2026

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী: স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে যাঁরা সততা, নিষ্ঠা এবং অতি সাধারণ জীবনযাপনের মাধ্যমে নিজেকে অমর করে রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (২ অক্টোবর ১৯০৪ – ১১ জানুয়ারি ১৯৬৬) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক নন—তিনি ছিলেন নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে ভারত কঠিন সময়েও আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস অটুট রাখতে পেরেছিল।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার সংগ্রাম

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জন্ম এক অতি সাধারণ পরিবারে। শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু অভাব কখনোই তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণাকে থামাতে পারেনি। স্কুলে যাওয়ার জন্য কখনো নদী সাঁতার কেটে পার হওয়ার কথাও জানা যায়। বারাণসীর কাশী বিদ্যাপীঠ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘শাস্ত্রী’ উপাধি—যা কোনো পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং তাঁর অর্জিত পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি।

স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ

মহাত্মা গান্ধী-র আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি অল্প বয়সেই স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ভারত ছাড়ো আন্দোলন—প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। জাতিভেদমুক্ত সমাজের স্বপ্নে তিনি নিজের পারিবারিক পদবি ‘শ্রীবাস্তব’ ত্যাগ করেন—যা ছিল তাঁর চিন্তার গভীর মানবিকতার প্রকাশ।

জয় জওয়ান, জয় কিষাণ ✨

প্রধানমন্ত্রীত্বকালে খাদ্য সংকট ও যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি এই অমর স্লোগান দিয়েছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় সবুজ ও শ্বেত বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়, যা ভারতকে খাদ্যে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে দেয়।

প্রশাসনিক সততার বিরল দৃষ্টান্ত

স্বাধীনতার পর তিনি উত্তরপ্রদেশ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। রেলমন্ত্রী থাকাকালীন এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ—ভারতীয় রাজনীতিতে আজও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। পুলিশ ব্যবস্থায় লাঠির বদলে জলকামান ব্যবহারের উদ্যোগ এবং পরিবহণ ক্ষেত্রে নারী কর্মীদের সুযোগ বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর মানবিক ও আধুনিক চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

প্রধানমন্ত্রীত্ব: সংকটের মধ্যেও দৃঢ় নেতৃত্ব

জওহরলাল নেহরু-র পরে যখন তিনি দেশের দায়িত্ব নেন, তখন খাদ্য সংকট ও সীমান্ত যুদ্ধ—দুটি বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামনে আসে। শান্ত কিন্তু দৃঢ় নেতৃত্বে তিনি দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে আমুল এবং জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন বোর্ড শক্ত ভিত পায়।

সাধারণ জীবন ও মহান আদর্শ

প্রধানমন্ত্রী হয়েও বিলাসিতা তাঁর জীবনে স্থান পায়নি। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে একটি গাড়ি কেনার জন্য তাঁকে ব্যাংক ঋণ নিতে হয়েছিল—এই ঘটনাই তাঁর সরলতা ও সততার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ক্ষমতার চেয়েও দেশের স্বার্থ ছিল তাঁর কাছে অগ্রাধিকার।

উত্তরাধিকার ও সম্মান 📚

  • মরণোত্তর ‘ভারত রত্ন’ সম্মান
  • স্মৃতিসৌধ: বিজয় ঘাট (দিল্লি)
  • সবুজ বিপ্লবের পথিকৃৎ
  • শ্বেত বিপ্লবের অনুপ্রেরণা
  • নৈতিক রাজনীতির মূর্ত প্রতীক
  • দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগ
  • সততা ও সংযমের আদর্শ
  • জাতীয় দুগ্ধ উন্নয়ন বোর্ড

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর জীবন কেবল ইতিহাস নয়—এটি প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এক নৈতিক দিকনির্দেশনা, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে মূল্যবান মানবিকতা, আর রাজনীতির চেয়ে বড় দেশপ্রেম।

home3