
কেশবচন্দ্র সেন (১৯ নভেম্বর ১৮৩৮ – ৮ জানুয়ারি ১৮৮৪) ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নবজাগরণের অন্যতম নেতা। ব্রহ্মানন্দ উপাধিতে ভূষিত তিনি শুধু ধর্মচিন্তা ও সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রেই নয়, ভারতীয় জাতীয় চেতনা ও ঐক্যের আদর্শ রূপকার হিসেবেও বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর নেতৃত্ব, চিন্তাধারা ও বক্তৃতা একসময় বাংলার শিক্ষিত সমাজকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।
পরিবার ও প্রারম্ভিক জীবন
কলকাতার কলুটোলার এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্য বংশে কেশবচন্দ্র সেনের জন্ম। তাঁর পিতামহ রামকমল সেন ছিলেন রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সেক্রেটারি। পিতা প্যারীমোহন সেন ছিলেন শিল্পরুচিসম্পন্ন শিক্ষিত ব্যক্তি, আর মা সারদাসুন্দরী দেবী ছিলেন রূপ, গুণ ও ব্যক্তিত্বে অনন্যা—যাঁর স্নেহ ও আদর্শ কেশবচন্দ্রের চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
শৈশব ও ছাত্রজীবন
খুব ছোটবেলা থেকেই কেশবের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক বিশিষ্টতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। প্রথমে ব্রাহ্মণ গুরুমশায়ের কাছে শিক্ষা শুরু করে পরে তিনি ভর্তি হন তৎকালীন হিন্দু স্কুলে। মেধা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে তিনি অন্য সবায়ের থেকে আলাদা ছিলেন। শান্ত, ধীর ও সংযত স্বভাবের জন্য তার তেজস্বী রূপ সেসময় সুপ্ত ছিল। হিন্দু কলেজে তিনি ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন, ন্যায়, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। কিছুদিনের জন্য তিনি হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজে শিক্ষালাভ করেন।
ইংল্যান্ড ভ্রমণ ✨
সমাজসংস্কার ও ধর্মচিন্তার প্রচারে তিনি পশ্চিমেও আগ্রহী ছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই তিনি ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন এবং সেখানে ছয় মাস অবস্থান করেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার সাথেও সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।
দর্শন ও চিন্তাধারা
কেশবচন্দ্র স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ভালোবাসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন—ধর্মের আসল উদ্দেশ্য হলো মানুষের উন্নতি এবং সমাজে ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা করা। ইউরোপীয় মিশনারিদের ভুল ধারণার প্রতিবাদ করে তিনি ভারতীয় ধর্ম ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবনা ও সামাজিক কর্মযজ্ঞে নতুন মাত্রা যোগ করে।
সমাজ সংস্কারে ভূমিকা
হিন্দুসমাজে বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা ও বর্ণপ্রথা বিলোপে তিনি ছিলেন দৃঢ় সমর্থক।
- মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
- পরে তার কন্যা সুনীতি দেবীর বিবাহকালে ব্রাহ্মপ্রথা লঙ্ঘিত হলে, কয়েকজন অনুগামী ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
- পরবর্তীতে নববিধান ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তিনি বিভিন্ন ধর্মমতের সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন ভাবধারার ধর্মচর্চা শুরু করেন।
গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ 📚
- সত্যবিশ্বাস
- জীবনবেদ
- সাধু-সমাগম
- দৈনিক প্রার্থনা
- মাঘোৎসব
- ইংলণ্ডে কেশবচন্দ্র সেন
- নবসংহিতা
- হাফেজ
