
বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে জীবনানন্দ দাশ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ – ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) এক অনন্য ও বিস্ময়কর নাম। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, পরাবাস্তবতা এবং নির্জনতার যে সুর তিনি বুনেছিলেন, তা আজও পাঠকদের আচ্ছন্ন করে রাখে। ‘রূপসী বাংলার কবি’ হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতার জগত বিস্তৃত ছিল ইতিহাস, সমাজ ও মানব অস্তিত্বের গূঢ় রহস্য পর্যন্ত।
জন্ম ও শৈশব
জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘মিলু’। তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত সাহিত্যমনা। পিতা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক এবং মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন প্রথিতযশা কবি, যাঁর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি আজও প্রতিটি বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। মায়ের হাত ধরেই মূলত তাঁর সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়।
শিক্ষা ও সংগ্রামী কর্মজীবন
বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে ম্যাট্রিক ও আইএ শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল চরম অস্থিরতা ও আর্থিক অনটনে ভরা। অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করলেও কোনো চাকরিতেই তিনি স্থায়ী হতে পারেননি। দীর্ঘ সময় তিনি বেকার ছিলেন এবং জীবনধারণের জন্য বীমা কোম্পানির এজেন্টের কাজও করেছেন।
কথাসাহিত্যের ‘রহস্য’ ✨
জীবদ্দশায় তিনি কেবল কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ১৯৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ট্রাঙ্ক থেকে আবিষ্কৃত হয় অসংখ্য পাণ্ডুলিপি। দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত নিভৃতে ২১টি উপন্যাস এবং ১০৮টি ছোটগল্প লিখে গিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’ বাংলা কথাসাহিত্যে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক ধারার সূচনা করে।
কাব্যজগত ও শৈলী
জীবনানন্দ দাশের কবিতা ছিল সমকালীন প্রথাগত রোমান্টিক ধারার বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তিনি কবিতায় নিয়ে এলেন কুয়াশা, ধূসরতা, হেমন্তের বিদায়ী সুর এবং নাগরিক জীবনের ক্লান্তি। তিনি প্রথম সার্থক পরাবাস্তববাদী (Surrealist) কবি হিসেবে স্বীকৃত, যাঁর কবিতায় অবচেতন মনের বিমূর্ত চিত্রকল্প উঠে আসত।
একটি মজার তথ্য: জীবনানন্দের আদি পদবি ছিল ‘দাশগুপ্ত’। কিন্তু ১৯২৭ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরাপালক’ প্রকাশের সময় থেকে তিনি পদবি থেকে ‘গুপ্ত’ বর্জন করে কেবল ‘দাশ’ লিখতে শুরু করেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থসমূহ 📚
- ঝরাপালক (১৯২৭)
- ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬)
- বনলতা সেন (১৯৪২)
- মহাপৃথিবী (১৯৪৪)
- সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)
- রূপসী বাংলা (মরণোত্তর)
- বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)
- জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং ২২ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর জীবনানন্দ দাশের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ১৯৫৫ সালে তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থটি মরণোত্তর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায়। তিনি আজ কেবল একজন কবি নন, বরং আধুনিক বাঙালির বিপন্ন বিস্ময় ও অস্তিত্বের এক গভীরতম স্বর।
