
হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৪ ডিসেম্বর ১৯১২ – ২২ নভেম্বর ১৯৮৭) ছিলেন একজন কিংবদন্তী ভারতীয় বাঙালি গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং দৃঢ়চেতা বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী। বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় নিজ সৃষ্টিকর্মে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখা এই শিল্পী মূলত লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। বিশেষত, তিনি চিরাচরিত ভাটিয়ালি গানে নতুন মাত্রা সংযোজন করে তাকে গণমানুষের আন্দোলনের হাতিয়ার করে তুলেছিলেন। সামাজিক পরিবর্তন ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার ধারক ও বাহক হিসেবে তাঁর শিল্পকর্ম তাঁকে গণসংগীতের জগতে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের হবিগঞ্জের মিরাশীতে। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হন। কলেজ জীবনেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়েই, ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং তাঁর জীবনের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপিত হয়।
দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কারাবন্দী হন এবং সেখানেই যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। এরপর যাদবপুর হাসপাতালে কিছুকাল চিকিৎসার পর তিনি মুক্তি পান। জীবনের শুরু থেকেই শিল্প ও রাজনীতিকে একত্রিত করে এক সংগ্রামী জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং প্রায় তিন বছর বন্দী জীবন কাটান।
কর্মজীবনের মূল অধ্যায় ও গণনাট্যের সংযোগ
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কর্মজীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আই.পি.টি.এ (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন)-এর সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। ১৯৩৮-৩৯ খ্রিষ্টাব্দে বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের সঙ্গে তিনি এই সংঘ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং পঞ্চাশের দশকে এই সংঘের শেষ অবধি তিনি এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রণে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করতে। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। সেই সময়ে তাঁর গান, যেমন—‘তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান’ এবং ‘কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে’— আসাম ও বাংলায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
১৯৬১ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে আসেন এবং সোভিয়েত কনস্যুলেটের ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ শুরু করেন। তবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য হওয়ায় তিনি কাজ ত্যাগ করেন। চীন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল; তিনি দুবার চিনে গিয়েছিলেন এবং চীনা ভাষাতেও তাঁর অনেক গান আছে।
গণসংগীতের বার্তা
আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগীত ‘ইন্টারন্যাশনাল’ ও রুশ সুরে তাঁর গাওয়া ‘ভেদী অনশন মৃত্যু তুষার তুফান’ গানটি কমিউনিস্ট কর্মীদের মধ্যে অতীব জনপ্রিয় হয়েছিল। এই গানটি ছিল ‘ইন দ্যা কল অফ কমরেড লেনিন’-এর ভাবানুবাদ।
প্রভাব ও উত্তরাধিকার
হেমাঙ্গ বিশ্বাস একজন আন্তর্জাতিক মনস্ক শিল্পী ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামে নিজের দল গঠন করে জীবনের শেষ দিকেও গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেরিয়েছেন। তিনি ‘কল্লোল’, ‘তীর’, ‘লাললণ্ঠন’ প্রভৃতি বিখ্যাত নাটকের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ‘লাললন্ঠন’ নাটকে তিনি বিভিন্ন চীনা সুর ব্যবহার করেছিলেন এবং রাশিয়ান গানও অনুবাদ করে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
তিনি আসামের জাতীয় সংস্কৃতির সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের, যেমন—জ্যোতি প্রসাদ, বিষ্ণু প্রসাদ রাভা, ভূপেন হাজরিকা—এঁদের মূল্যায়ন করে গেছেন এবং বঙ্গীয় সমাজের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় ঘটিয়েছেন। তাঁর কাজ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিল্প শুধু বিনোদনের জন্য নয়, তা শোষিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও সংকলন
গানের সংকলন ও বিখ্যাত গান:
- হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান (সংকলন)
- শঙ্খচিলের গান (সংকলন)
- জন হেনরীর গান
- মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য
- আমি যে দেখেছি সেই দেশ
- মশাল জ্বালো
লোকসঙ্গীত ও শিক্ষামূলক গ্রন্থ:
- লোকসঙ্গীত সমীক্ষা বাংলা ও আসাম
- আকৌ চীন চাই আহিলো
- কুল খুরার চোতাল
- জীবন শিল্পী জ্যোতি প্রসাদ
শিল্পী সত্তা অমর
হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছিলেন প্রগতিশীলতার মূর্ত প্রতীক। তিনি তাঁর শিল্পকে মানুষের মুক্তি, সংগ্রাম ও ভালোবাসার কাজে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল এক আপোসহীন সংগ্রাম এবং তাঁর প্রতিটি গান ছিল সেই সংগ্রামেরই প্রতিধ্বনি। সঙ্গীতের মাধ্যমে সমাজের দুর্বল শ্রেণির প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সঞ্চারিত করার যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা আজও বাংলার গণসঙ্গীত জগতে এক স্থায়ী ও অনুপ্রেরণামূলক উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে।
