Bangla Panjika 2026

রাবণবধের মাধ্যমেই শুভ শক্তির জয়লাভ! দশেরার উত্‍সব এখানে এত বিখ্যাত কেন?

১। দশেরা উৎসব | Dussehra Festival in Bengali

নবরাত্রি উৎসব দশেরা পালনের সাথে শেষ হয়। দশেরা উৎসব ভারতের একটি অন্যতম সাংস্কৃতিক উৎসব। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দশেরা উৎসব ভিন্ন ভিন্ন প্রথা পালনের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। জায়গা বিশেষে প্রথা ভিন্ন হলেও এটি প্রধানতঃ নারীশক্তির পূজার মধ্যে দিয়েই পালিত হয়। ভারতবর্ষে অনেক জায়গায় দশেরা বিজয়াদশমী নামেও পরিচিত। দশেরা উৎসব মূলতঃ পালিত হয় “অশুভর ওপর শুভর জয়” বা “দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন” করার জন্য।

নবরাত্রিতে অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার পর দশম দিনে আমরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্টান পালনের মধ্যে দিয়ে ইতিবাচক শক্তিগুলিকে স্বাগত জানাই এবং সকল জাগতিক ও মহাজাগতিক জিনিসগুলির ওপর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। নবরাত্রির নয়টি দিনকে তমঃ, রজঃ এবং সত্যে -এই তিনটি মৌলিক গুণ অনুসারে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম, দ্বিতীয়া ও তৃতীয়া তমঃগুণের প্রতিনিধিত্ব করে যেখানে দেবী দুর্গা ও কালীর পূজা হয়। তৃতীয়া, চতুর্থী ও পঞ্চমীতে দেবী লক্ষ্মীর পূজা হয় যিনি শান্ত এবং সম্পদের দেবী। ষষ্ঠী, সপ্তমী ও অষ্টমী দেবী সরস্বতীকে উৎসর্গ করা হয় যিনি জ্ঞান এবং বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী।

২। দশেরার উৎপত্তি | Origin of Dusshera in Bengali

দশেরা উৎসব হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ থেকে অনুসৃত হয়েছে। লঙ্কারাজ রাবণের সাথে লড়াই করে রাজা রাম কিভাবে অসুর শক্তিকে দমন করেছিলেন সেই নিয়েই এই মহাকাব্যটি লিখেছিলেন বিখ্যাত কবি মহর্ষি বাল্মীকি। ইতিহাস অনুসারে রামায়ণ ৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রামায়ণ লেখা হয়েছিল।

৩। রামায়ণের গল্প | Story of Ramayana in Bengali

“রামায়ণ” শব্দটি ২ টি সংস্কৃত শব্দের মিশ্রণ “রাম” এবং “আয়ন”। এর অর্থ হলো রাজা “রামের সময়ের গল্প”। রামকে ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার হিসাবে ভাবা হয় যিনি মহান ত্রিত্ব অর্থাৎ ভগবান ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বরের একটি অংশ। হিন্দুরা রামকে প্রাচীনকাল থেকেই একজন দেবতা হিসেবে পূজা করেন।

রামায়ণ মহাকাব্য অনুসারে রাজা দশরথ তাঁর জেষ্ঠ্যপুত্র রামচন্দ্রকে অযোধ্যার রাজা হিসাবে মনোনীত করেন। কিন্তু দশরথ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কৈকেয়ীর ইচ্ছাপূরণের জন্য বাধ্য হয়ে রামচন্দ্রকে ১৪ বছরের জন্য বনবাসে পাঠান। রামচন্দ্রের সাথে তাঁর স্ত্রী সীতা এবং ভাই লক্ষ্মণও বনবাসে যান।

বনবাসে থাকার সময় লঙ্কারাজ রাবণ রামচন্দ্রের স্ত্রী সীতাকে অপহরণ করে লঙ্কায় নিয়ে যান। তখন রামচন্দ্র বানররাজ সুগ্রীবের সাথে জোট বেঁধে লঙ্কায় যান স্ত্রীকে উদ্ধার করতে।

কিন্তু পরাক্রমশালী রাবণ তাঁর স্ত্রীকে শান্তিপূর্ণভাবে ফিরিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় রামচন্দ্র যুদ্ধ ঘোষণা করেন। রাম এবং রাবণের মধ্যে ৯ দিন ধরে যুদ্ধ চলার পর দশম দিনে রাম রাবণকে বধ করেন এবং সীতাদেবীকে মুক্ত করেন। কথিত আছে রামচন্দ্র সেই সময় দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। তাই দুর্গাপূজা শেষে বিজয়াদশমীতে তথা রাম-রাবণের যুদ্ধের এই দিনটিতে “দশেরা” উৎসব পালন করা হয়।

রামায়ণ | Ramayana

Source: detechter.com

৪। ভারতের বিখ্যাত দশেরা উৎসব | Famous Dussehra Festivals of India in Bengali

ঐতিহ্যগতভাবে ভারতীয় সংস্কৃতিতে দশেরা উৎসব রাবণ বধ নাটিকা এবং নৃত্যানুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয়।  ভারতীয়দের কাছে এই তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে আনন্দ ও ভালবাসার সাথে উদযাপন করে। দশেরা উৎসব মহাকাব্য রামায়ণকে কেন্দ্র করে পালিত হলেও ভারতের বিভিন্ন অংশে এই উৎসব পালনের মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন। নিম্নলিখিত অনুচ্ছেদগুলিতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দশেরা উৎসব পালনের পদ্ধতি সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো –

(১) কুল্লু দশেরা | Kullu Dussehra

কুল্লু দশেরা হিমাচল প্রদেশের কুল্লু উপত্যকায় উদযাপিত হয়। এই উপলক্ষ্যে বিশাল মেলা হয়। কুল্লু দশেরা দশেরার দিনে শুরু হয় এবং এক সপ্তাহ ধরে চলে। উৎসবটি ভগবান রঘুনাথের দ্বারা অশুভের ওপর শুভর বিজয়ের প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়।

কুল্লু দশেরা উৎসব উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ শোভাযাত্রা বের হয়। এই শোভাযাত্রায় কুলুর নিকটবর্তী অঞ্চলের বিভিন্ন অংশ থেকে দেবতা রঘুনাথকে জলের ওপর দিয়ে নৌকা করে ধোলাপুরে নিয়ে আসা হয়। প্রায় ২০০ টিরো বেশি ভগবান রঘুনাথের মূর্তি ধোলাপুর ময়দানে রথযাত্রায় অংশ নেয়। এরপর সপ্তাহ জুড়ে প্রতিদিন রামলীলা অনুষ্ঠান উদযাপন কুল্লু দশেরা উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই উপলক্ষ্যে গাদ্দি সম্প্রদায়ের রাখালেরা লোকসঙ্গীত ও লোকনৃত্য পরিবেশনা করে।

কুল্লু দশেরা | Kullu Dussehra

Source: www.deccanherald.com, www.outlookindia.com

(২) দিল্লি দশেরা | Delhi Dussehra

নবরাত্রি পালনের সাথে সাথে দশেরা উপলক্ষ্যে দিল্লি শহরটি আলোকিত করে তোলা হয়। দিল্লিতে দশেরা উদযাপনের প্রধান জায়গা হল রামলীলা ময়দান। এখানে দশ দিন ধরে রামায়ণের বিভিন্ন পর্বগুলি নিয়ে নাটক পরিবেশিত হয় এবং  প্রখ্যাত কলাকুশলীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। এর সাথে সাথে সংগীতানুষ্ঠান এবং নৃত্যানুষ্ঠানও পরিবেশিত হয়।

বিভিন্ন মন্দিরে ভগবান রামকে পূজা করা হয় এবং পুরোহিতরা ভগবান রামের শ্লোক পাঠ করেন। দশেরার দিন রামলীলা ময়দানকে উজ্জ্বলভাবে আলোকিত করা হয় এবং সন্ধ্যার সময় রাবণ, মেঘনাথ এবং কুম্ভকর্ণের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।

দিল্লি শহর জুড়ে কিছু  বিখ্যাত জায়গা যেমন শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্র, লাল কিলা ময়দান, আগস্ট পার্ক এবং মাধভাস পার্কে দশেরা উৎসবের আয়োজন করে।

দিল্লি দশেরা | Delhi Dussehra

Source: www.revv.co.in

(৩) কোটা দশেরা | Kota Dussehra

কোটা দশেরা উপলক্ষ্যে রাজস্থানের কোটাতে চম্বল নদীর পাড়ে এক ঐতিহ্যবাহী বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ দুর্জানশাল সিং হাদারের আমলে এই মেলা  শুরু হয়। মেলার সাথে সাথে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যা বিভিন্ন গ্রামীণ পরম্পরাকে তুলে ধরে। সুসজ্জিত ঘোড়া, উট এবং হাতি সহকারে কোটার রয়্যাল প্যালেস থেকে মেলার মাঠ পর্যন্ত একটি চিত্তাকর্ষক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামবাসীরা কোটার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন এবং সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। উৎসবের সমাপ্তি উপলক্ষ্যে বিজয়াদশমীর দিনে রাবণের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিযোগিতা যেমন গোঁফ প্রতিযোগিতা, মুশাইরা এবং কবি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

কোটা দশেরা | Kota Dussehra

Source: www.hindustantimes.com, www.rajasthantourtrip.com

(৪) বারাণসী দশেরা | Varanasi Dussehra

বারাণসীতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক মাস ব্যাপী রামলীলা অনুষ্ঠিত হয়। রামনগর ফোর্টের পাশে গঙ্গা নদীর তীরে এই অনুষ্ঠান রাম অবতারের জন্ম থেকে রাক্ষসরাজ রাবণের বধ পর্যন্ত যাত্রা, নাটক, ভক্তিমূলক গান এবং নৃত্যানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। দুর্গ এলাকাটির বিভিন্ন জায়গাগুলি এমনভাবে সাজানো হয় যে সেগুলি রামায়ণে বর্ণিত স্থানগুলি যেমন অযোধ্যা, লঙ্কা, রামের বনবাস, অশোক বনের প্রতিরূপ তৈরী করে। অভিনেতারা যখন গাথা পরিবেশনের সাথে সাথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যান দর্শকরাও তখন তাঁদের সঙ্গে চলেন। এই উৎসব উপলক্ষ্যে গঙ্গা নদীর তীরে এক বিশেষ আরতির আয়োজন করা হয়। স্থানীয় মানুষরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালনের সাথে সাথে নদীতীরে জড়ো হন এবং ভক্তিমূলক গান গাইতে গাইতে নদীর জলে মাটির প্রদীপ ভাসান।

বারাণসী দশেরা | Varanasi Dussehra

Source: wideangleadventure.com, www.india.com

(৫) আলমোড়া দশেরা | Almora Dussehra

এই উৎসব উপলক্ষ্যে আলমোড়ার স্থানীয় মানুষেরা রামায়ণের অশুভ শক্তিগুলির মূর্তি তৈরি করে এবং তাদের নিয়ে শোভাযাত্রা করে। শোভাযাত্রাটি একটি নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় গিয়ে শেষ হয় এবং সেখানে কুশপুত্তলিকাগুলি পোড়ানো হয়। সাধারনতঃ এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাবণ বংশের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। শোভাযাত্রায় মিউজিক ব্যান্ড এবং সাজসজ্জা সহ শত শত মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

আলমোড়া দশেরা | Almora Dussehra

Source: www.uttranews.com, utsav.gov.in

(৬) কোলকাতা দশেরা | Kolkata Dussehra

কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ শারদীয়া উপলক্ষ্যে দুর্গোৎসব পালন, নাচ, গান, খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে দিয়ে খুবই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজা হল কলকাতার শ্রেষ্ঠ উৎসব। দূর্গা প্রতিমার সুসজ্জিত প্যাণ্ডেল, বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং আলোর রোশনাই কলকাতা দশেরার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

দুর্গাপূজার শেষে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে দশেরা উৎসব বিজয়াদশমী হিসাবে খুব জাঁকজমক সহকারে পালিত হয়। ধুনুচি নাচ, ভোগ বিতরণ, বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দূর্গা মূর্তি এর প্রধান আকর্ষণ।

বিজয়াদশমীতে দূর্গা মাকে বরণ করা হয় এবং সধবা মহিলারা নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলেন। এরপর শোভাযাত্রা সহকারে মা দুর্গার মূর্তিকে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। দূর্গা মা এবং তাঁর সন্তানদের মূর্তি বিসর্জন হয়ে গেলে ধরে নেওয়া হয় যে তাঁরা সকলে আবার ভোলানাথ শিবের কাছে কৈলাশে পাড়ি দিলেন। এরপর পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। পরিবারের ছোটরা বড়দেরকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে এবং বড়রা ছোটদেরকে আশীর্বাদ করেন।

কোলকাতা দশেরা | Kolkata Dussehra

Source: www.latestly.com

কোলকাতা দশেরা | Kolkata Dussehra

Source: vedictribe.com, foodiewish.com

(৭) বাস্তার দশেরা | Bastar Dussehra

ভারতের দশেরা উৎসবগুলির মধ্যে ছত্তিশগড়ের বাস্তার দশেরা উৎসব একেবারেই অন্যভাবে উদযাপন করা হয়। এই উৎসব স্থানীয় দেবীকে উৎসর্গ করে পালন করা হয় এবং এটি ভগবান রামের বিজয়ের সাথে একেবারেই সম্পর্কিত নয়। এই উৎসব বিশ্বের দীর্ঘতম উৎসবগুলির মধ্যে একটি এবং এটি ৭৫ দিন ধরে পালিত হয়।

বিশ্বাস করা হয় যে ১৩ শতকে বাস্তার রাজা পুরুষোত্তমদেব এই প্রথা শুরু করেন। উৎসব চলাকালীন আদিবাসী সম্প্রদায় পাতা যাত্রা, দেরি গধাই, কাচন গাড়ি, নিশা যাত্রা, মুরিয়া দরবার এবং শেষ দিনে ওহাদি বা দেবতাদের বিদায়ের মতো বেশ কয়েকটি আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন।

এই সময় তাঁরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেন এবং কিছু বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় যেমন কোনো যুবকের নয় দিন ধরে শুধু মাথাটি বের করে মাটির নিচে থাকা, অসংখ্য লোক দিয়ে একটি বিশাল রথ টানা, আদিবাসী ড্রাম বাজানো এবং তার তালে তালে আদিবাসী নৃত্য ইত্যাদি।

বাস্তার দশেরা | Bastar Dussehra

Source: www.outlookindia.com, www.chhattisgarhgyan.in

(৮) আমেদাবাদ দশেরা | Ahmedabad Dussehra

ঘাঘরা-চোলি এবং কাফনি পায়জামার বৈচিত্র্যময় রঙের সাথে গরবা নৃত্য নবরাত্রির আমেদাবাদ তথা গুজরাটের পরিবেশকে খুব সুন্দর করে তোলে। হাজার হাজার গুজরাটি মহিলা মাতৃদেবীর আরাধনায় এবং অশুভর বিরুদ্ধে শুভর জয়ের আশায় একটি বৃত্ত তৈরি করে মাটির প্রদীপের চারপাশে নৃত্য করেন। গুজরাটে দেবী দুর্গা এবং ভগবান রাম উভয়ই মন্দের বিরুদ্ধে তাঁদের বিজয়ের জন্য পূজিত হন। ডান্ডিয়া নাচের পরিবেশনও আমেদাবাদ দশেরার একটি প্রধান অংশ।

আমেদাবাদ দশেরা | Ahmedabad Dussehra

Source: www.lifeberrys.com, www.republicworld.com

(৯) গোয়া দশেরা | Goa Dusshera

গোয়াতে স্থানীয় কোঙ্কনি ভাষায় এই উৎসবটি “দশরা” নামে পরিচিত। দেবী দুর্গার মহিষাসুরের বিরুদ্ধে বিজয় উপলক্ষ্যে গোয়া দশেরা পালন করা হয়। গোয়াতে “তরঙ্গ” নামে একটি পবিত্র ছাতা গ্রামের দেবতাদের মাথায় ধারা হয়। অনেক মন্দিরে তরঙ্গ নৃত্য পরিবেশিত হয়। এই দিনে দেবতাদের উদ্দেশ্যে “সীমোল্লাংঘন” নামে একটি আচার অনুষ্ঠিত হয়। এই উপলক্ষ্যে গ্রামের মানুষেরা তাঁদের গ্রামের সীমানাতে একটি প্রতীকী ক্রসিং তৈরি করেন এবং দেবতাদের মূর্তিগুলি একটি বিশাল শোভাযাত্রা সহকারে সেখান দিয়ে নিয়ে যান। এই আচারের সাথে ঐতিহ্যগত মিল হিসেবে বলা যায় প্রাচীনকালে রাজারা তাঁদের রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে প্রতিবেশী রাজ্যের সাথে যে যুদ্ধ করতেন। কিন্তু সীমোল্লাংঘনে দুই পার্শ্ববর্তী গ্রামের উপস্থিত লোকেরা “আপত্যাচি পানা” বিনিময় করেন। এটি স্বর্ণের প্রতীক এবং এই আচারটি স্বর্ণে বিনিময়ের একটি প্রতীকী উপস্থাপনা।

গোয়া দশেরা কৃষকদের ফসল কাটার উৎসব হিসাবেও উদযাপিত হয়। এই উদযাপনের পরে কৃষকেরা খরিফ ফসল যেমন ধান, গুয়ার, তুলা, সয়াবিন, ভুট্টা, বাজরা, ডাল ইত্যাদি কাটা শুরু করে।

গোয়া দশেরা | Goa Dusshera

Source: itsgoa.com, timesofindia.indiatimes.com

(১০) মহারাষ্ট্র দশেরা | Maharashtra Dusshera

মহারাষ্ট্রে দশেরা উৎসবটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ এবং ১৮ শতকে শিবাজী এবং পেশোয়ারা তাঁদের নতুন সামরিক অভিযান শুরু করতেন। উত্তর মহারাষ্ট্রে এই উৎসবটি “দশরা” নামে পরিচিত এবং এই দিনে লোকেরা নতুন জামাকাপড় পরেন এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের ও গ্রামের মন্দিরের দেবতাদের চরণ স্পর্শ করেন। নবরাত্রির প্রথম দিনে স্থাপিত দেবতাদের জলে নিমজ্জিত করা হয়। সকলে একে অপরের সাথে দেখা করেন এবং মিষ্টি বিনিময় করেন। ওয়ার্লি এবং কোকনার উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষরা সোনার প্রতীক হিসাবে “আপ্তা” গাছের পাতা বিনিময় করেন।

মহারাষ্ট্র দশেরা | Maharashtra Dusshera

Source: www.nativeplanet.com, www.tourmyindia.com

(১১) মহীশূর দশেরা | Mysore Dusshera

“নাদাহাব্বা” বা কর্ণাটকের রাজ্যের প্রধান উৎসব মহীশূর দশেরা ৪০০ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে। এই উৎসবটি স্থানীয়ভাবে “মাইশুরু দশরা” নামে পরিচিত। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর বিজয় উপলক্ষ্যে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। নবরাত্রির শেষে দশম দিনে একটি রাজকীয় শোভাযাত্রা বের করা হয় এবং সেই শোভাযাত্রায় একটি সুসজ্জিত হাতির ওপরে পূজিত দেবীর মূর্তিকে রাখা হয়। মহীশূর প্রাসাদের আলোকসজ্জা এবং রাজপরিবারের অংশগ্রহণ মহীশূর দশেরার জনপ্রিয় আকর্ষণ।

মাইশুরু দশরায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সামরিক কুচকাওয়াজ, গ্র্যান্ড শোভাযাত্রা, মার্চ পাস্ট, ট্যাবলো, নাচ, মার্শাল আর্ট  এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। “গোলু” নামের একটি বিশেষ রঙিন পুতুল দিয়ে একটি বিশেষ  প্রদর্শনী বানানো হয়। মাইশুরু দশরা উপলক্ষ্যে “জাম্বো সাভারি” বা হাতির শোভাযাত্রা বের হয় এবং এই শোভাযাত্রাকে রাজ পরিবারের সুসজ্জিত হাতিরা নেতৃত্ব দেয়।

মহীশূর দশেরা | Mysore Dusshera

Source: thesocialtalks.com, www.financialexpress.com

(১২) কুর্গ (মাদিকেরি) দশেরা | Coorg (Madikeri) Dussehra

দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের হিল স্টেশন কুর্গে ১০০ বছরের পুরানো এই দশেরা উৎসব “মাদিকেরি দশরা” নামেও পরিচিত। মাদিকেরি দশরা ৪ টি কারাগা এবং ১০ টি মন্তপ দিয়ে সাজানো হয় এবং এতে দেবতাদের দ্বারা অসুরদের বধ করার চিত্র চিত্রিত করা হয়। লোকশ্রুতি আছে যে মাদিকেরির মানুষ বহু বছর আগে একটি রোগে আক্রান্ত হয়। তখন মাদিকেরির রাজা “মারিয়াম্মা” উৎসব শুরু করেন। মহালয়া অমাবস্যার পরদিন থেকে এই উৎসব শুরু হয়।

মাদিকেরি শহরে ৪টি মারিয়াম্মা মন্দির রয়েছে – ডান্ডিনা মারিয়াম্মা, কাঞ্চি কামাক্ষম্মা, কুন্দুরুমোত্তে শ্রীচৈতি মারিয়াম্মা এবং কোটে মারিয়াম্মা। এই মারিয়াম্মা মন্দিরগুলির প্রতিটিতে কারাগা বের হয়। এই চারটি কারাগা শহরের দেবতাদের শক্তিকে প্রতিনিধিত্ব করে। কারাগা হলো চাল ও নয় প্রকার শস্য এবং পবিত্র জলে ভরা একটি পাত্র যা নৌকার ওপর রাখা হয় এবং সুন্দর করে সাজানো হয়। এই কারাগাগুলি দশরার ৫দিন ধরে মাদিকেরি শহরের মধ্যে এবং আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। এই আচারগুলি পাণ্ডবদের স্ত্রী দেবী দ্রৌপদীকে উৎসর্গ করা হয়।

মাদিকেরি দশরাকে স্বাগত জানানোর জন্য নবরাত্রির নবম দিনে সারারাতব্যাপী অনুষ্ঠান হয়। স্থানীয় শিল্পীদের অনুষ্ঠান, দেব-দেবী-অসুরদের হাইটেক যান্ত্রিক মূর্তি, নৃত্য ও সঙ্গীতের পরিবেশনা এবং সমগ্র শহর জুড়ে শোভাযাত্রা এই উৎসবের মূল আকর্ষণ।

কুর্গ (মাদিকেরি) দশেরা | Coorg (Madikeri) Dussehra

Source: www.kodagufirst.in, www.madikeridasara.com

(১৩) কুলসাই (কুলসেকারপট্টিনাম) দশেরা | Kulasai (Kulasekarapattinam) Dussehra

তামিলনাড়ুর থুথুকুডি জেলার কুলাসেকারাপট্টিনম গ্রামে কুলসাই দশরা পালিত হয়। এই উৎসবটি ৩০০ বছরের পুরানো মুথারম্মান মন্দিরের দেবী কালীকে উৎসর্গ করে উদযাপিত হয়। কুলসাই দশরা উপলক্ষ্যে ভক্ত এবং তীর্থযাত্রীরা তাঁদের আরাধ্য দেব-দেবীর রূপে সজ্জিত হন এবং ভক্তরা মা কালীকে স্মরণ করে সারা রাত নৃত্য করে। এই উৎসব উপলক্ষ্যে মহিষাসুর বধ একটি নাটকীয় উপায়ে সমুদ্র সৈকতে অনুষ্ঠিত হয়। সমুদ্র সৈকতটি আলোকসজ্জায় সাজানো হয় এবং সেখানে মেলা বসে ও কুলসাই দশরা সম্পর্কিত বিভিন্ন নাটক পরিবেশিত হয়।

কুলসাই (কুলসেকারপট্টিনাম) দশেরা | Kulasai (Kulasekarapattinam) Dussehra

Source: www.indianpanorama.in, www.religionworld.in

(১৪) বাথুকাম্মা দশেরা | Bathukamma Dusshera

বাথুকাম্মা উৎসবটি নয় রাত ধরে পালিত হয়। মহিলারা বাথুকাম্মার চারপাশে রামায়ণের গান, শিব-গৌরী-গঙ্গার গান এবং মহিলাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিভিন্ন ছন্দময় গানের সাথে নেচে নেচে ঘুরতে থাকে। এই উৎসব দেবী দুর্গাকে মহাগৌরী রূপে পূজা করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো তেলেঙ্গানার হিন্দুরা আয়ুধা পূজাও করেন। বাথুকাম্মা দশেরা উপলক্ষ্যে পরিবারের সদস্য এবং বন্ধু-বান্ধবদের সাথে প্রীতিভোজ অনুষ্ঠিত হয়।

বাথুকাম্মা দশেরা | Bathukamma Dusshera

Source: swarajyamag.com, www.thenewsminute.com

(১৫) নেপাল দশেরা | Nepal Dasshera

নেপালে “দশইন” উৎসবের শেষে বিজয়াদশমী পালন করা হয়। অল্পবয়সীরা তাদের পরিবারের বড়দের সাথে দেখা করে, যাঁরা দূরে থাকেন তাঁরা নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন এবং ছাত্ররা স্কুলের শিক্ষকদের সাথে দেখা করে। প্রবীণ এবং শিক্ষকরা তরুণদের স্বাগত জানান এবং তাদের কপালে টিকা পরিয়ে দিয়ে তাদের সাফল্য ও সমৃদ্ধির জন্য আশীর্বাদ করেন। এই উৎসব শুক্লপক্ষ থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত ১৫ দিন ধরে পালিত হয়।

নেপাল দশেরা | Nepal Dasshera

Source: www.giftstoindia24x7.com, www.quora.com

৫। দশেরার ধর্মীয় তাৎপর্য | Religious Significance of Dussehra in Bengali

ভগবান রামকে হিন্দু ধর্মের প্রধান তিনটি দেবতার মধ্যে একজন ভগবান বিষ্ণুর অবতার হিসেবে ধরা হয়। তাঁকে “মর্যাদা পুরুষোত্তমা” হিসাবে উল্লেখ করা হয় কারণ তিনি হিন্দু নীতিবোধকে অনুসরণ করে জীবনের চ্যালেঞ্জগুলির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাই দশেরা উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে শুভ জয় বলে মনে করা হয়।

রাবণ শুধুমাত্র একজন শক্তিশালী রাজা ছিলেন না তিনি একজন মহান যোদ্ধা, শিক্ষিত ব্যক্তি এবং শিল্পীও ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর অহংবোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন এবং অন্যান্যদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সাথেও দুর্ব্যবহার করেন। তাঁর অত্যাচার থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে ভগবান বিষ্ণু রামের অবতারে পৃথিবীতে আসেন এবং রাবণের সাথে ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। তাই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ভগবান রামের বিজয়ের দিনটি ভারতে দশেরা উৎসব হিসাবে পালিত হয়।

৬। দশেরার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য | Spiritual Significance of Dussehra in Bengali

ভগবান রামকে “আত্মচেতনা”-র প্রতীক হিসাবে মনে করা হয়। সেই সাথে রাবণের দশটি মাথাকে দশটি নেতিবাচক আবেগ বা শক্তি হিসাবে ধরা হয় যা আমাদেরকে আত্ম-উপলব্ধি থেকে দূরে রাখে। এই দশটি নেতিবাচকতা হল অহং, অসহিষ্ণুতা, অনুশোচনা, রাগ, লোভ, হিংসা, লালসা, অসংবেদনশীলতা, ভয় এবং ঘৃণা। জীবনে চলার পথে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই দশটি নেতিবাচকতা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের জীবনে আসে। কিন্তু আমাদেরকে এই নেতিবাচক আবেগগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে। অন্যথায় আমরা নিজেদের লক্ষ্য থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে যাব। তাই আমাদেরকে নিজেদের ইন্দ্রিয় বা আবেগের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে, তাকে জয় করতে হবে।

৭। দশেরার বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য | Scientific Significance of Dussehra in Bengali

বিজয়াদশমী – বিজয় দিবস | Vijayadashami – The Day of Victory

আমরা যদি রজঃ, তমঃ এবং সত্য এই তিনটি গুণের যে কোনো একটির অধিকারী হয় তবে আমরা কোনো না কোনো শক্তির অধিকারী হব। কিন্তু পার্থিব বস্তু থেকে সবকিছুর উর্দ্ধে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নবরাত্রির পরে বিজয়াদশমী প্রকৃত অর্থে এই তিনটি গুণকে জয় করার প্রতীক। আমাদের সকলকেই জীবনের প্রকৃত লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে এই তিনটি গুণকে জয় করতে হবে। পার্থিব সমস্ত কিছুর প্রতি শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা কীভাবে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে বিজয়াদশমী তারই বার্তা নিয়ে আসে।

দশেরা – ভক্তি ও শ্রদ্ধা | Dussehra – Devotion and Reverence

জীবনে চলার পথে আমরা অনেক কিছুর সংস্পর্শে আসি এবং আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সেগুলির কোনো না কোনো অবদান থাকে। কিন্তু জীবনে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আমাদের শরীর এবং মন। আমরা যে মাটিতে হাঁটছি, যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, যে জল পান করছি, যে খাবার খাচ্ছি, আমাদের সংস্পর্শে যেসব মানুষ আসছেন এবং আমাদের শরীর এই সবকিছুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল এবং কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। তবেই আমাদের মন অশুভ গুণগুলিকে দূরে রেখে আমাদেরকে শুভ কাজে অনুপ্রাণিত করবে এবং সফলতার পথ দেখাবে।

monochetana.com

home3