
দয়ানন্দ সরস্বতী (১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৪ — ৩০ অক্টোবর ১৮৮৩) ছিলেন একজন প্রভাবশালী হিন্দু ধর্মগুরু, সমাজ সংস্কারক এবং আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা। পশ্চিম ভারতের কাথিয়াওয়াড় অঞ্চলের এক নিষ্ঠাবান সামবেদী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মহান মনীষীর গার্হস্থ্য নাম ছিল মূলশংকর। বাল্যকাল থেকেই তিনি সংস্কৃতশাস্ত্র, বেদ, ব্যাকরণ, দর্শন, কাব্য ও তর্কশাস্ত্রে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। কুসংস্কার দূরীকরণ, বেদের সত্য জ্ঞান প্রচার এবং সমাজ সংস্কার ছিল তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
বাল্যজীবন
শৈশবে তিনি ধর্মপরায়ণ পরিবারের আদর্শে বড় হন। আট বছর বয়সে যজ্ঞোপবীত সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। ইংরেজি শিক্ষার সুযোগ না থাকলেও তিনি সংস্কৃতশাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে যজুর্বেদসহ অন্যান্য বেদ ও দর্শনশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
চেতনার জাগরণ ✨
শিশুকালে একটি ঘটনার মাধ্যমে তাঁর মনে মূর্তিপূজা সম্পর্কে সংশয় জন্মায়। শিবরাত্রির উপবাসকালে শিবমূর্তির উপর ইঁদুর দৌড়াতে দেখে তাঁর বিশ্বাসে প্রশ্ন জাগে। এখান থেকেই সত্যের অনুসন্ধান ও বৈরাগ্যের বীজ বপন হয়। পরপর পারিবারিক শোক, বোন ও কাকার মৃত্যু, তাঁকে জীবনের অর্থ ও অমরত্বের পথ খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে। পরবর্তীতে তিনি গৃহত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।
সত্যান্বেষণের পথ
দয়ানন্দ সরস্বতী প্রায় ১৫ বছর ধরে নর্মদা তীর থেকে হিমালয়ের শিখর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সাধুসঙ্গে, মঠে ও মন্দিরে ধ্যান-যোগের মাধ্যমে সত্যের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। এই সময়ে তিনি ব্রহ্মচর্য দীক্ষা গ্রহণ করে ব্রহ্মচারী শুদ্ধাচৈতন্য নাম ধারণ করেন। পরে পূর্ণানন্দ সরস্বতীর নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করে সন্ন্যাস-পরিচয়ে দয়ানন্দ সরস্বতী হন। মথুরায় গুরু বিরজানন্দ দণ্ডীর শিষ্যত্ব গ্রহণ তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনে। গুরু তাঁকে হিন্দুধর্মের শুদ্ধ বৈদিক পথ প্রচারের দায়িত্ব দেন।
মতবাদ প্রচার ও কুসংস্কারের বিরোধিতা
তৎকালীন সমাজে মূর্তিপূজা, অনর্থক আচার, ব্রাহ্মণিক ভোগবাদ, অন্ধবিশ্বাস ও শ্রাদ্ধকেন্দ্রিক আচারকে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন— “সাধনার জন্য বাহ্যিক চিহ্নের প্রয়োজন নেই।” তিনি নারীর অধিকার, বেদপাঠে সকলের সমঅধিকার, বাল্যবিবাহ-প্রথার বিরোধিতা এবং নিরাকার একেশ্বরবাদ প্রচার করেন।
কাশী শাস্ত্রার্থ
বারাণসীর ঐতিহাসিক কাশী শাস্ত্রার্থে তিনি তৎকালীন পণ্ডিতদের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন। মূল আলোচ্য বিষয় ছিল— বেদ কি মূর্তিপূজাকে সমর্থন করে? দয়ানন্দ তাঁর বিশুদ্ধ বৈদিক যুক্তিবাদ ও বেদজ্ঞান দ্বারা পণ্ডিতসমাজকে পরাজিত করেন এবং সমগ্র ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন।
বৈদিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
১৮৬৯–১৮৭৩ সালের মধ্যে তিনি ফররুখাবাদ, মির্জাপুর, কাসগঞ্জ, চালিসা এবং বারাণসীতে একাধিক বৈদিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিদ্যালয়গুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল:
- মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ
- প্রতিদিন সন্ধ্যোপাসনা ও অগ্নিহোত্র
- বিনামূল্যে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও বই
- অ-ব্রাহ্মণদের সংস্কৃতশিক্ষার সুযোগ
আর্য সমাজ ও স্বরাজ
বেদ-আধারিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তিনি বোম্বাইয়ে প্রথম আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি হিন্দু সমাজের আধুনিক চিন্তা, স্বরাজ, শিক্ষা ও সংস্কার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দয়ানন্দ সরস্বতীর চিন্তা-চেতনা ভারতীয় জাতীয়তাবাদে গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর রচনাগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস ছিল।
তাঁর দ্বারা প্রভাবিত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বগণ হলেন: ভগত সিং, বিনায়ক দামোদর সাভারকর, লালা লাজপত রায়, ম্যাডাম কামা প্রমুখ।
রচিত গ্রন্থ ও সাহিত্য 📚
- সত্যার্থ প্রকাশ
- ঋগ্বেদাদিভাষ্য ভূমিকা
- যজুর্বেদ ভাষ্য
- ভাগবত খণ্ডনম্
- অদ্বৈতমত খণ্ডনম্
- গোকরুণানিধি
- বেদাঙ্গপ্রকাশ
শেষ জীবন ও প্রভাব
যোধপুরে প্রাসাদে অবস্থানকালে এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি বিষক্রিয়ার শিকার হন। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি দোষীকে ক্ষমা করে মানবিকতার বিরল উদাহরণ স্থাপন করেন। ১৮৮৩ সালে আজমীরে তিনি ঈশ্বরনাম জপ করতে করতে ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি শুধু একজন ধর্মগুরু নন—তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতীয় সমাজ সংস্কার, জাতীয়তাবাদ এবং শিক্ষাবিস্তারের অন্যতম স্থপতি।
