Bangla Panjika 2026

ব্রাহ্মণ মিত্র শর্মা ও তিন ঠক্ – নীতিমূলক গল্প

মিত্রশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ পূজা করতে যজমান বাড়ি গিয়েছিল। ফেরার পথে যজমান তাকে একটি ছাগল দিয়ে বলল, ঠাকুরমশাই, এটাকে আপনি বাড়ি নিয়ে যান, বড় হলে দুধ খেতে পারবেন। মিত্রশর্মা খুশীমনে ছাগলটাকে কাঁধে চাপিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।

পথে একজায়গায় তিন ঠগ বসেছিল। নানাভাবে লোক ঠকানোই ওদের কাজ। ছাগল কাঁধে মিত্রশর্মাকে দেখতে পেয়ে তার ছাগলটার ওপর ঠগদের বড় লোভ হল। অমনি তিনজন ঠগ যুক্তি করে তিনদিকে চলে গেল।

মিত্রশর্মা তো হন হন করে চলেছে বাড়ির দিকে। এমন সময় প্রথম ঠগের সঙ্গে তার দেখা হল। দেখা হতেই ঠগ বলল, পেন্নাম হই ঠাকুরমশাই। কিন্তু একি লজ্জার কথা আপনি একটা পথের কুকুর কাঁধে চাপিয়ে চলেছেন। লোকে দেখতে পেলে যে আপনার নিন্দা করবে।

মিত্রশর্মা কথা শুনে রেগে গিয়ে বলল, পাগল না কি হে তুমি, দেখছ ছাগল, বলছ কি না কুকুর। তোমার মাথার ঠিক নেই বাপু, যাও যাও। বাড়ি চলে যাও।

ঠগ বলল, বেশ ঠাকুর, আমার কথা বিশ্বাস হলো না, পরে টের পাবেন।

মিত্রশর্মা কিছুদুর যেতে না যেতেই দ্বিতীয় ঠগের সঙ্গে দেখা হল। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠল, একি ঠাকুর মশাই একটা মরা কুকুর নিয়ে কোথায় চললেন?

ব্রাহ্মণ এবার রেগেই গেল। বলল, অন্ধ নাকি হে তুমি, চোখে দেখতে পাচ্ছ না এটা কি?

ঠগ বলল, ঠিক দেখতে পাচ্ছি বলেই তো বলছি ঠাকুর মশাই, কি করে মরা কুকুরটাকে আপনি জ্যান্ত মনে করে কাঁধে তুলে নিয়ে চলেছেন।

ব্রাহ্মণ বলল, খুব হয়েছে, এবারে বাড়ী যাও। যত্ত সব পাগল। এ পথটা দেখছি ভাল নয়, কেবল পাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বলে মিত্রশর্মা রেগেমেগে হন হন করে হাঁটতে শুরু করল।

আবার কিছুদূর যেতে না যেতেই তৃতীয় ঠগের সঙ্গে তার দেখা হল। ঠগ দূর থেকে তাকে দেখতে পেয়েই মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। তারপর হাত জোড় করে কাছে এগিয়ে এসে বলল, ঠাকুরমশাই বুঝি কোথাও যাচ্ছেন?

ব্রাহ্মণ বুঝল, এ-ও উল্টোপাল্টা কিছু বলবে নিশ্চয়। রেগেমেগে জবাব দিল, কেন, কিছু বলবে নাকি?

ঠক বলল, না ঠাকুর মশাই কি আর বলব। তবে বলছিলাম কি গাধার বাচ্চাকে কাঁধে চাপিয়ে অমন করে কোথায় চলেছেন! বলে সে মুখে হাত চাপা দিয়ে বেদম হাসতে শুরু করল। তার সে হাসি আর যেন থামতে চায় না।

ব্রাহ্মণ রাগে বিরক্তিতে আর কোন কথা না বলে সোজা এগিয়ে যেতে লাগল। পেছন থেকে ঠগ তখন চেঁচিয়ে বলল, ঠাকুর সামনেই হাট, লোকে আপনার কাঁধে গাধার বাচ্চা দেখলে আপনাকে টিটকিরি করবে।

ব্রাহ্মণ এবারে চলতে চলতে ভাবতে লাগল, তাই তো পর পর তিন জন লোকেই তিন রকম কথা বলল, নিশ্চয়ই ছাগলটার কোথাও কোন গোলমাল রয়েছে। দরকার নেই বাপু অমন ছাগল বাড়ি নিয়ে গিয়ে, শেষে কিসে থেকে কি হয়ে যাবে। এই ভেবে তখনই ছাগলটাকে কাঁধ থেকে পথে নামিয়ে দিল।

ওদিকে ঠগ তিন জন পেছন পেছনই একটু আড়াল রেখে এগিয়ে আসছিল। যেই দেখল ব্রাহ্মণ ছাগলটাকে পথে নামিয়ে দিয়েছে অমনি তিন ঠগ এগিয়ে এসে হাসি চেপে ছাগলটাকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে একেবারে এক ছুটে বাড়ী। তারপর সেই ছাগলের মাংস দিয়ে তোফা এক ভোজ।

কুমন্ত্র থেকে দূরে থাকা উচিত।

ত্যাগী বলবান ও বিদ্বানের সঙ্গে থাকলে গুণ বাড়ে। গুণ হলে ধন আসে, ধন থেকে প্রভুত্ব, ক্রমে পাওয়া যায় রাজত্বও।

অস্ত্রের আঘাতে শত্রু মরে, কখনো মরেও না। কিন্তু প্রজ্ঞা বা জ্ঞানের আঘাতে শত্রুর বিনাশ হয় নিশ্চিত। অস্ত্র কেবল শরীরেই আঘাত করে। বংশ, যশ, ঐশ্বর্য সব ধ্বংস হয় প্রজ্ঞার আঘাতে।

শত্রু যখন বন্ধু সেজে আসে তখন কখনো হিতকর পরামর্শ দেয় না।

বুদ্ধির প্রথম লক্ষণ হল কাজ শুরু না করা, বুদ্ধির দ্বিতীয় লক্ষণ-কাজ শুরু করলে তা শেষ করা।

home3