Bangla Panjika 2026

বেণী মাধব দাস : এক আদর্শ শিক্ষক ও প্রাজ্ঞ মনীষী

বেণী মাধব দাস (২২ নভেম্বর ১৮৮৬ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৫২) ছিলেন এক প্রাজ্ঞ বাঙালি পণ্ডিত, শিক্ষক এবং দেশপ্রেমিক। তাঁর হাতে বহু শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞান অর্জন করেননি, শিখেছেন নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের সত্যিকারের অর্থ। শরৎচন্দ্র বসু, সুভাষচন্দ্র বসুসহ আরও অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব তাঁর ছাত্র ছিলেন—এটাই তাঁর শিক্ষাদর্শনের শক্তির প্রমাণ।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা

বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার শেওড়াতলী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দাস। দর্শনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি শিক্ষকতার মাধ্যমে নিজের পথ তৈরি করেন। প্রথমে চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি এক আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ দেন। পরে ঢাকা, কটকের র‍্যাভেনশ স্কুল, কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল এবং কলকাতার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেন। ব্রাহ্ম নেতা কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে তিনি ব্রাহ্ম সমাজে যুক্ত হন এবং সমাজের প্রকাশনা— ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার নববিধান-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তাঁর ভূমিকা

শিক্ষকতা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান পরিচয়। দর্শনের পাশাপাশি অর্থনীতি ও ইতিহাসেও তিনি ছিলেন সমান পণ্ডিত। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি এক অধ্যাত্মিক ও মানবিক পরিবেশ তৈরি করত। তিনি অল ইন্ডিয়া থেইস্টিক কনফারেন্সের সভাপতিত্বও করেন, যা পরবর্তীতে মডার্ন থেইস্টিক মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রবন্ধ সংকলন Pilgrimage Through Prayers সমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা অর্জন করেছিল। সুভাষচন্দ্র বসুও তাঁর ভারত পথিক গ্রন্থে বেণী মাধবের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।

তাঁর ছাত্র নিরঞ্জন নিয়োগীর ভাষায়— তাঁর প্রশাসনে কোনও কঠোরতা ছিল না, কোনও জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শন ছিল না – তাঁর শীতল এবং মনোমুগ্ধকর আচরণ তাঁর ছাত্রদের উপর অসাধারণ প্রভাব ফেলত। এমনকি যারা অশান্ত ছিল তারাও শান্ত হয়ে যেত, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠত এবং তাঁর স্নেহে আকৃষ্ট হত।

পারিবারিক জীবন ✨

বেণী মাধব দাসের পরিবার ছিল রাজনৈতিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়। তাঁর মেজ ছেলে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য কারাবরণ করেন। পত্নী সারদা দেবী ছিলেন সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এবং ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট কর্মী মধুসূদন সেনের কন্যা। তাদের দুই কন্যা— কল্যাণী দাস (ভট্টাচার্য) এবং বীণা দাস (ভৌমিক) —দু’জনই জনসেবা ও স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।

কল্যাণী দাস ছাত্রী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী ছিলেন। ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর সমাবর্তনে বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন কে পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যা প্রচেষ্টার জন্য ৯ বছর কারা বরণ করেন। দুই মেয়ের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে বেণী মাধব দাস শুধু সমর্থনই করেননি, বরং সাহস জুগিয়েছিলেন।

মৃত্যু

বেণী মাধব দাস তার সারা জীবন ব্রাহ্ম সমাজের কল্যাণে নিবেদন করেন। তিনি ১৯৫২ সালের ২রা সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যু বরণ করেন।

home3