Bangla Panjika 2026

বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে ‘বাংলার বাঘ’ হিসেবে  আমরা সকলেই জানি৷ তেজস্বী, দৃঢ়চেতা, কর্তব্যে কঠোর ও কর্মে আপোষহীন স্বভাবের জন্যই স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে বাংলার বাঘ হিসেবে সন্মানিত হয়েছিলেন। তাঁর অহং আহত হয়েছিল বলে জমে ওঠা ওকালতী নির্দ্ধিধায় ছেড়ে দিয়েছিলেন, কাজের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে বলে জতিয়েতী ছেড়ে দিয়েছিলেন, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অনুদান পেল ন’ লাখ টাকা আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পেল মাত্র এক লাখ টাকা। তখন এই প্রবঞ্চনার প্রতিবাদে ভাইসচ্যান্সেলারের পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন, বেয়াদব ইংরেজ তাঁর কোট ফেলে দিলে তাকে হাতেনাতে শিক্ষা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালির মেরুদণ্ড কতখানি শক্ত! একজন মহান আইনজ্ঞ, একজন ব্যারিস্টার এবং একজন গণিতবিদ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গণিত ও পদার্থবিদ্যায় দ্বৈত স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করা প্রথম ছাত্র এই মহান ব্যক্তিত্ব জন্ম গ্রহণ করেন ১৮৬৪ সালের ২৯ জুন, কলকাতার ভবানীপুরে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন৷ পিতা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক আর মা হলেন জগত্তারিণী দেবী৷

১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি কালীঘাটের সাউথ সুবার্বন বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি এন্টার্স পাশ করেন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এফ.এ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন তাঁর সহপাঠী। তিনি ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বি.এ ও ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং উভয় পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি PRS পরীক্ষার দিয়ে বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে এম.এস.সি, ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন শাস্ত্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘ডক্টর অফ ল’ লাভ করেন।

তাঁর কর্মজীবন বহুমুখী৷ তিনি কলকাতা হাইকোর্টের একজন কৃতী বিচারপতি ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ছিলেন ৷ তিনি ছিলেন স্বদেশ প্রেমী ৷ তিনি নাইট উপাধি পেয়েও দেশেরও দেশবাসীর উন্নতির জন্য বহুবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে দ্বিধা করেননি ।

উডের ডেসপ্যাচের সুপারিশ অনুযায়ী ১৮৫৭ সালের আইনের বলে ভারতে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে কলকাতা, বোম্বাই ও  মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মূল কাজ ছিল পরীক্ষা নেওয়া ও ডিগ্রি নেওয়া ৷এখানে পঠনপাঠন ও গবেষণার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মনে করতেন উচ্চ শিক্ষার কাজ হল পঠনপাঠন, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা। ইতি মধ্যে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ভারতের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় গুলিকে শিক্ষাদান কারী প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তোলা৷ তিনি ১৯০৪ এর বিশ্ববিদ্যালয় আইনকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য তিনি প্রস্তাব দেন :

১. ছাত্রদের মাতৃভাষার জ্ঞানের ওপর জোর দিতে হবে

২. ছাত্রদের প্রবেশিকা বাদে অন্যান্য পরীক্ষায় নৈপুণ্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে

৩. পি.এইচ.ডি ও ডি.এস.সি উপাধি প্রবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে

৪. বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও বিজ্ঞানচর্চার ব্যবস্থা করতে হবে ও স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ, অধ্যয়ণ ও গবেষণার বিষয়ে জোর দিতে হবে।

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের লক্ষ্য ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তোলা ৷ এর  জন্য তিনি অধ্যাপক নিয়োগ, নিজস্ব গ্ৰন্থাগার স্থাপন, গবেষণাগার গড়ে তোলা, শিক্ষক নিয়োগ প্রভৃতি ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করা হয়।  তাঁর অক্লান্ত চেষ্টায় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১ টি বিষয় স্নাতকোত্তর স্তরে পঠনপাঠনের ব্যবস্থা হয়।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরে পঠনপাঠনের জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার জন্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামাঙ্কিত চেয়ারের সূত্রপাত করেন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে অর্থনীতিতে অধ্যাপনার জন্য লর্ড মিন্টোর নামে চেয়ার প্রবর্তন করেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (রসায়ন) ও চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন (ভৌত বিজ্ঞান) প্রথম পালিত অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। গনেশ প্রসাদ (ফলিত গণিত), প্রফুল্ল মিত্র (রসায়ন), দেবেন্দ্র মোহন বোস (ভৌত বিজ্ঞান), এস. পি. আগরকর (উদ্ভিদ বিদ্যা), রাসবিহারী ঘোষ অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে (দর্শন শাস্ত্র) যোগদান (১৯২১) আহ্বান জানিয়ে ছিলেন এবং পরবর্তীকালে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন ৷দেশীয় ভাষা, ইংরেজি, ভূগোল, গনিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন শাস্ত্র ইতিহাস (ভাবত ও ইংল্যান্ডের) প্রভৃতি বিষয় পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তিনি শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় শ্রেনির শিক্ষাবিদদের সম্মিলনে বিশ্বাসী ছিলেন।

শিক্ষাকে বৈষম্য মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।  সরকারের বিভিন্ন বৈষম্য মূলক নীতির তীব্র বিরোধীতা থেকে কখনো পিছিয়ে আসেননি। তিনি শিক্ষার মাধ্যমে একতা চেয়েছিলেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন জাতীয় ভাবগত ঐক্যের ওপর। প্রলোভন তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি, সহজে তিনি উপাচার্য পদ ত্যাগ করে ইস্পাত কঠিন হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি সাহসিকতার জন্য প্রকৃত ‘বাংলার বাঘ’ হয়ে উঠেছিলেন। চারিত্রিক দৃঢ়তার জন্য জাতীয়তাবাদী নেতা চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁকে ‘a Dynamic Personality’ বলে অকপটে স্বীকার করেন।

১৯২২ সালের সমাবর্তনী অভিভাষণে দেশমাতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন-

স্বদেশ আমার! তোমার সেবায় এ ব্রত লইনু আজি

পুজিতে তোমার আনিব খুঁজিয়া ধরণীর ধনরাজি

তুমি যদি চাও প্রাণ প্রিয়ধন-দ্বিধা না জাগিবে মনে

শুধাব না কথা, প্রফুল্ল বদনে এনে দেব ও চরণে’

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছাত্র জীবনে কেবলমাত্র অধ্যয়ণে নিমগ্ন থাকতেন এমন নয়। জাতিয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার সলতে পাকানোর কাজটা শুরু করেন ছাত্র-জীবনে। ঔপনিবেশিক আমলে দেশের প্রতি ভালোবাসা বা ভারতীয়দের জাতি গঠন সম্পর্কে সর্বদা সচেতন ছিলেন। স্কুল জীবনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে একনিষ্ঠ সক্রীয় কর্মী ছিলেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কর্মজীবন হাইকোর্টের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁর প্রাণ ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৮৮৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের সদস্য হিসাবে মনোনীত হওয়ার পর থেকে ভারতের শিক্ষার সংস্কারের মধ্যদিয়ে দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তার বেশিরভাগ জীবন অতিবাহিত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ছিল তাঁর কাছে মাতৃ স্বরূপ। এছাড়াও তিনি ১৯০৬ সালে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অফ সায়েন্স প্রতিষ্ঠা করেন।

তাঁর মৃত্যুতে বাঙালি জাতি যে একজন অভিভাবককে হারিয়েছিলো তা সন্দেহ নেই। হারিয়ে যাওয়া যন্ত্রণা থেকে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন:

বাঙলার শের বাঙলার বীর

বাঙলার বাণী বাঙলার বীর

সহসা-ও-পারে অস্তমান

এপারে দাঁড়ায়ে দেখিল ভারত মহা-ভারতের মহাপ্রয়াণ”

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী৷ তাঁর দৃঢ়তা, ঐকান্তিকতা, তেজস্বিতা, একাগ্রতা, তাঁর আদর্শ আমাদের Bangla Panjika প্রত্যেকে  অনুসরণ করার চেষ্টা করি ৷ আজ তাঁর জন্মদিনে, তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম জ্ঞাপন করি ৷

home3