
পরিচিতি:
হিন্দু ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণা (অন্য নাম অন্নদা) শক্তির এক বিশেষ রূপ। তিনি অন্নের দেবী — যিনি সকল প্রাণীর খাদ্য ও পুষ্টি প্রদান করেন। তাঁর আবাস কাশী (বারাণসী)। পার্বতীরই এক রূপ হিসেবে তিনি পরিচিত।
দেবী অন্নপূর্ণার মন্ত্র: “হ্রীং নমো ভগবতি মাহেশ্বরি অন্নপূর্ণে স্বাহা”
প্রণাম মন্ত্র: “অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে শঙ্করপ্রাণবল্লভে। জ্ঞানবৈরাগ্যসিদ্ধ্যর্থং ভিক্ষাং দেহি নমোঽস্তুতে।।”
দেবীর রূপ বর্ণনা
দেবী অন্নপূর্ণা সাধারণত দ্বিভুজা ও ত্রিনয়নী।
- এক হাতে অন্নপাত্র (ভাতের থালা)
- অন্য হাতে দর্বী (হাতা)
তিনি রক্তবর্ণা, সফরাক্ষী, স্তনভারনম্রা, বিচিত্র বসনা পরিহিতা। মাথায় নবচন্দ্রকলা। তিনি সর্বদা অন্নপ্রদায়িনী এবং ভবদুঃখহন্ত্রী। কোনো কোনো বর্ণনায় তাঁকে চতুর্ভুজা রূপেও দেখা যায়।
পৌরাণিক উপাখ্যান (সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনী)
বিবাহের পর শিব ও পার্বতী কৈলাসে সুখে বাস করছিলেন। শিব দরিদ্র ছিলেন বলে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। একদিন পাশা খেলার সময় শিব পার্বতীকে “মায়া” বলে অপমান করেন। রাগে পার্বতী কৈলাস ত্যাগ করেন।
তাঁর অনুপস্থিতিতে ত্রিলোকে অন্নের হাহাকার পড়ে যায়। শিব ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে অন্নের সন্ধান করতে থাকেন, কিন্তু কোথাও অন্ন পান না। অবশেষে কাশীতে এসে তিনি দেখেন — এক নারী সকলকে অন্নদান করছেন। সেই নারী ছিলেন আদ্যাশক্তি পার্বতীই, অন্নপূর্ণা রূপে।
শিব অন্ন গ্রহণ করে তৃপ্ত হন এবং দেবীর মহিমা প্রচারের জন্য কাশীতে অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে দেবী সেখানে অবতীর্ণ হন।
পূজা-অর্চনা ও উৎসব
- পূজার তিথি: চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী
- পশ্চিমবঙ্গে এই পূজার বিশেষ প্রচলন আছে (শান্তিপুর, নবদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে বারোয়ারি পূজা হয়)
- অন্নকূট উৎসব: কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দিরে অত্যন্ত বিখ্যাত
- বিশ্বাস: অন্নপূর্ণার পূজা করলে গৃহে কখনো অন্নাভাব হয় না
পূজা মূলত তান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়, কালী ও জগদ্ধাত্রী পূজার মতো। তন্ত্রগ্রন্থ যেমন — বৃহৎ তন্ত্রসার, অন্নদাকল্প, শারদাতিলকতন্ত্র ইত্যাদিতে পূজাপদ্ধতির বিবরণ আছে।
বিখ্যাত মন্দির
- কাশী অন্নপূর্ণা দেবী মন্দির (সবচেয়ে প্রসিদ্ধ)
- পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন স্থানে অন্নপূর্ণা মন্দির আছে
- হোরানাডু (কর্ণাটক) অন্নপূর্ণেশ্বরী মন্দিরও খুব বিখ্যাত
সাহিত্যে অন্নপূর্ণা
রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচিত অন্নদামঙ্গল কাব্যে দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য অপূর্বভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ভারতচন্দ্র লিখেছেন: “যে জন করয়ে অন্নপূর্ণা উপাসনা। বিধি হরি হর তার করয়ে মাননা।। ইহলোকে নানা ভোগ করে সেই জন। পরলোকে মোক্ষ পায় শিবের লিখন।।”
মাইকেল মধুসূদন দত্তও “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি” কবিতায় দেবীর প্রশস্তি করেছেন।
উপসংহার
মা অন্নপূর্ণা শুধু অন্নদাত্রী নন, তিনি জ্ঞান ও বৈরাগ্যেরও দাত্রী। তাঁর কৃপায় গৃহে অন্ন, সুখ ও শান্তি বিরাজ করে।
জয় মা অন্নপূর্ণা! জয় অন্নদা!
আরও পড়ুন…👇👇👇
