Bangla Panjika 2026

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়: বাঙালি ইতিহাসচর্চার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১ মার্চ ১৮৬১ — ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি ইতিহাসবেত্তা, সমাজসেবক ও গবেষক। মানবিক জ্ঞানের নানাবিধ শাখায়—বিশেষত ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা ও প্রত্নতত্ত্বে—তাঁর কাজ অসামান্য অবদান রেখে গেছে। তিনি রাজশাহী পৌর কর্পোরেশনের কমিশনার, বরেন্দ্র গবেষণা সোসাইটির পরিচালক এবং রাজশাহী আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

প্রাথমিক জীবন

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার গৌরনাইয়ের এক বরেন্দ্র বর্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি কিছুদিন কুষ্টিয়ার মিরপুরের শিমুলিয়া গ্রামে মামা ভবানন্দ মজুমদারের বাড়িতে বড় হন। পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় হরিনাথ মজুমদারের কাছে, যিনি কাঙ্গাল হরিনাথ নামে পরিচিত ছিলেন।

দশ বছর বয়সে তিনি রাজশাহীতে বাবা মথুরানাথ মৈত্রেয়র কাছে চলে যান। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এনট্রান্স, রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ এবং পরবর্তী সময়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ সম্পন্ন করেন। পরে আবার রাজশাহী কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়ে রাজশাহীতে ওকালতি শুরু করেন।

লেখালেখি ও গবেষণার সূচনা

শৈশব থেকেই অক্ষয়কুমার পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করতেন। বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যে পাণ্ডিত্যসহ তিনি নানা প্রবন্ধ ও গবেষণা নিবন্ধ রচনা করেন। তাঁর প্রকৃত আগ্রহ ছিল বাংলার ইতিহাসচর্চা—যা তিনি শুরু করেন ভুল ও বিকৃত উপাখ্যান সংশোধনের তাগিদ থেকে।

ইতিহাস রচনার জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য, প্রত্নতত্ত্ব ও লোককথা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর গবেষণায় বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস, শিল্পকলা ও পটশিল্প সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ১৮৯৯ সালে তিনি ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ নামে প্রথম বাংলা ত্রৈমাসিক ইতিহাসপত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, সাহিত্য ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।

বরেন্দ্র গবেষণা ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা

বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য আবিষ্কারে তিনি দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের কুমার শরৎকুমার রায় এবং শিক্ষক রমাপ্রসাদ চন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে বিস্তৃত প্রত্নগবেষণা শুরু করেন। এই অভিন্ন আগ্রহের ফলস্বরূপ তাঁরা বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯১০ সালে গঠিত রাজশাহী জাদুঘর—বর্তমান বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর—প্রতিষ্ঠা পায় তাঁদেরই উদ্যোগে। অক্ষয়কুমার ছিলেন জাদুঘরের পরিচালক এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদান

অক্ষয়কুমার ছিলেন রাজশাহী রেশম-শিল্প বিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, যেখানে তিনি সম্পাদক ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী পৌরসভার কমিশনার হিসেবে তিনি শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। ডায়মন্ড জুবিলি ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুলেও তিনি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি অবৈতনিক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। শিল্প-সংস্কৃতি, নাট্যচর্চা, ক্রিকেট এবং চিত্রাঙ্কনেও তাঁর সুনাম ছিল।

সিরাজউদ্দৌলা ও ইতিহাস সংশোধন ✨

ব্রিটিশ ঐতিহাসিকেরা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বিকৃত ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করায় অক্ষয়কুমার তীব্র আপত্তি জানান। তাঁর ‘সিরাজদ্দৌলা’ (১৮৯৮) গ্রন্থে তিনি তথ্য–প্রমাণসহ ব্রিটিশ বর্ণনার ভুল ধরিয়ে দেন। ১৯১৬ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির এক সভায় তিনি প্রমাণ করেন যে ‘অন্ধকূপ হত্যা’ আসলে ব্রিটিশদের প্রচারিত একটি মিথ্যা গল্প। ইতিহাস সংশোধনের এই ভূমিকা তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়।

প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ 📚

  • সমরসিংহ
  • সিরাজদ্দৌলা
  • সীতারাম রায়
  • মীর কাসিম
  • গৌড়লেখমালা
  • ফিরিঙ্গি বণিক
  • অজ্ঞেয়বাদ

সম্মাননা

  • কায়সার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক (১৯১৫)
  • CIE — Companion of the Order of the Indian Empire (১৯২০)

উপসংহার

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন বাংলা ভাষায় আধুনিক ইতিহাস গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ। প্রত্নতত্ত্ব, সাহিত্য, ইতিহাস ও সমাজসংস্কৃতি—সবক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদান আজও প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। বাংলার ইতিহাসচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর নামেই উজ্জ্বল হয়ে আছে।

home3