
কৌশিকী অমাবস্যার কথা উঠলেই আমাদের তারাপীঠের কথা বেশি মনে পড়ে। কৌশিকী অমাবস্যায় বড় সংখ্যক ভক্তরা ভিড় জমান তারা ধামে। তবে এই তিথির রয়েছে বিশেষ মাহাত্ম্য। কৌশিকী অমাবস্যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পৌরাণিক কাহিনীও। এই পূণ্য তিথিতে কিছু নিয়ম মেনে চললে খুলে যেতে পারে ভাগ্যের বন্ধ দরজা।
এই তিথিতে শুধু তারাপীঠে পুজো নয়, বিশেষ একটি নিয়ম প্রচলিত রয়েছে ব্রাহ্মণ সমাজে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো-সহ বিভিন্ন ধার্মিক উপাচারে পুরোহিতদের হাতে দেখা যায় কুশ। কিন্তু কুশ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে কিছু বাধা নিষেধ রয়েছে। ব্রাহ্মণদের বিশ্বাস, কৌশিকী অমাবস্যা কুশ সংগ্রহ করলে, তাতে দোষ হয় না। ফলে এদিন ব্রাহ্মণরা কুশ সংগ্রহ করে রাখেন। সেই কুশ সারা বছর বিভিন্ন পুজোয় ব্যবহার করেন ব্রাহ্মণরা। এদিন কুশের আসনে দেবীকে বসিয়ে পুজো করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায় বলে জ্যোতিষ মতে বিশ্বাস।
এ দিন দেবী কালিকার বা দেবী পার্বতীর আরাধনা করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায়। বাড়িতে যদি দেবী তারার মূর্তি অথবা ফটো থাকে, সেখানেও প্রার্থনা করতে পারেন। এদিন স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে দেবীর সামনে ফল, মিষ্টি দিয়ে ভোগ নিবেদন করতে হবে। লাল জবার মালা পরাতে হবে। আর একইসঙ্গে দেবীর সামনে জ্বালিয়ে দিতে হবে ঘিয়ের প্রদীপ। তাহলে জীবন থেকে অনেক বাধা কেটে যাবে।
ব্যবসায়ীরা দেবীর পুজো করলে বিশেষ ফল পাবেন। জ্যোতিষ মতে, ব্যবসা, অর্থভাগ্যের কারক বৃহস্পতি। আর বৃহস্পতির ইষ্ট দেবী তারা। ফলে কৌশিকী অমাবস্যায় তারা দেবীর পুজো করলে বিশেষ ফল পাবেন ব্যবসায়ীরা।
কবে কখন কতক্ষন থাকছে কৌশিকী অমাবস্যা
উপবাস = ৬ই ভাদ্র (আলোক, কৌষিকী বা কৌষি), শনিবার ২৩ আগস্ট ২০২৫
অমাবস্যা আরম্ভ = ৫ই ভাদ্র, শুক্রবার দিন ১১:৫৫ হইতে
অমাবস্যা শেষ = ৬ই ভাদ্র, শনিবার দিন ১১:২৪ পর্যন্ত।

কৌশিকী অমাবস্যার মাহাত্ম্য
কথিত আছে সাধক বামাক্ষ্যাপা, ১২৭৪ বঙ্গাব্দে কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠ মহাশ্মশানে শ্বেতশিমূল বৃক্ষের তলায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। ধ্যানমগ্ন বামাক্ষ্য়াপা এদিন তারা মায়ের আবির্ভাব পান। এছাড়াও শোনা যায়, এই তিথিতে কৌশিকী রূপে মা তারা বিশেষ সন্ধিক্ষণে, শুম্ভ- নিশুম্ভ নামক অসুরদের দমন করেছিলেন। সেই নাম থেকেই ‘কৌশিকী অমাবস্যা’ নামটি এসেছে।
কৌশিকী অমাবস্যার পৌরাণিক ইতিহাস
মা তারা হলেন দশ মহাবিদ্যার দ্বিতীয় মহাবিদ্যা। কৌশিকী তারই আরেক রূপ। মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, এক সময় মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবতারা অতিষ্ট ছিলেন। তখনই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেন৷ কিন্তু এই শান্তি বেশিদিন থাকে না। শুম্ভ- নিশুম্ভের অত্যাচারে দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এরপর সকলে পার্বতীর স্মরণাপন্ন হলে, দেবতাদের রক্ষা করতে মা মহামায়া তাঁর ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত করে, এক দেবীমূর্তির জন্ম দেন৷
দেবী কৌশিকী অযোনিসম্ভবা ছিলেন, সেই কারণে কৌশিকী দেবীই শুম্ভ ও নিশুম্ভকে বধ করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে দেবী কৌশিকীর শরীর থেকে হাজারও যোদ্ধৃ মাতৃকাকুল সৃষ্ট হয় এবং তারাই সমগ্র অসুরকুলকে বিনাশ করে। এই ঘটনাটি ভাদ্র অমাবস্যায় ঘটে। তাই পরবর্তীকালে এটি কৌশিকী অমাবস্যা নামে পরিচিত হয়।
তারাপীঠে কৌশিকী অমাবস্যা
কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠ শ্মশানে চলে তন্ত্রমন্ত্রের বিশেষ যোগ্য। বৌদ্ধ ও হিন্দু তন্ত্রে এই দিনের এক বিশেষ মাহাত্ম্য আছে। তন্ত্র মতে, এই রাতকে ‘তারা রাত্রি’ও বলা হয়। এক বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরক দুইয়ের দরজা মুহূর্তের জন্য খোলে ও সাধক নিজের ইচ্ছা মতো ধনাত্মক অথবা ঋণাত্মক শক্তি সাধনার মধ্যে আত্মস্থ করেন ও সিদ্ধিলাভ করেন।
কৌশিকী অমাবস্যা নিয়ে বিশ্বাস
বিশ্বাস অনুযায়ী, কৌশিকী অমাবস্যা তিথিতে বিশেষ পুজোয় অংশগ্রহণ করে দ্বারকা নদীতে স্নান করলে জীবনের সব পাপ থেকে মুক্তি মেলে। এদিন সঠিক উপায়ে তন্ত্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে, জীবনের সমস্ত বাঁধা বিপত্তি কেটে যায়, সহজে। ফি বছর হাজার হাজার ভক্তেরা কৌশিকী অমাবস্যার দিন ছুটে যান তারাপীঠ মন্দিরে।
