
লীলা মজুমদার (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯০৮ – ৫ এপ্রিল ২০০৭) ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি লেখিকা। তিনি শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে এক অমর নাম। কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা প্রমদারঞ্জন রায় এবং মাতা সুরমাদবী। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন তাঁর জ্যাঠামশাই, সেই সূত্রে তিনি সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন এবং সত্যজিৎ রায়ের পিসিমা ছিলেন।
শিক্ষা ও ব্যক্তিজীবন
লীলা মজুমদারের বাল্যজীবন কেটেছে শিলং-এ। সেখানকার লরেটো কনভেন্টে তিনি প্রাথমিক পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে তিনি উত্তীর্ণ হন।
১৯৩৩ সালে তিনি দন্ত চিকিৎসক ডাঃ সুধীর কুমার মজুমদারকে বিবাহ করেন। এই বিবাহে তাঁর পিতার প্রবল বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বনির্বাচিত পাত্রকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে পিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়, তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট ছিল। বিবাহিত জীবনে তাঁরা খুব সুখী দম্পতি ছিলেন এবং স্বামী আজীবন তাঁর সাহিত্য চর্চায় উৎসাহী ছিলেন। তাঁদের এক পুত্র ডাঃ রঞ্জন মজুমদার ও এক কন্যা কমলা চট্টোপাধ্যায়।
কর্মজীবন ও শেষ দিনগুলো ✨
১৯৫৬ সালে তিনি কলকাতা বেতারে যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল থেকে তিনি পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনে থাকতে শুরু করেন এবং এক পর্যায়ে বিশ্বভারতীর ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৭ সালের ৫ই এপ্রিল সেখানে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
সাহিত্যজীবন
লীলা মজুমদারের সাহিত্যিক জীবন ছিল প্রায় আট দশকের। ১৯২২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ‘লক্ষ্মীছাড়া’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি সন্দেশ পত্রিকার সাম্মানিক সহ-সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখায় হাস্যরস, কল্পনা এবং ছোটদের মনের রহস্য অত্যন্ত সহজ ভাষায় ফুটে উঠত।
সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর তাগিদে তাঁর প্রথম বড়দের গল্প ‘সোনালি রুপালি’ প্রকাশিত হয় বৈশাখী পত্রিকায়। এছাড়াও তিনি ইংরেজি থেকে অনেক শিক্ষামূলক ও রম্যরচনা বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম 📚
- হলদে পাখির পালক
- টং লিং
- পদিপিসির বর্মিবাক্স
- নাকু গামা
- সব ভুতুড়ে
- মাকু
- গল্পসল্প
- বদ্যিনাথের বড়ি
- দিন দুপুরে
- মনিমালা
- বাঘের চোখ
- বক ধার্মিক
- টাকার গাছ
- লাল নীল দেশলাই
- আগুনি বেগুনি
- আর কোনখানে (আত্মজীবনী)
- পাকদণ্ডী (আত্মজীবনী)
- খেরোর খাতা
- এই যে দেখা (স্মৃতিকথা)
- বক বধ পালা
পুরস্কার ও সম্মাননা
- আনন্দ পুরস্কার
- ভারত সরকারের শিশু সাহিত্য পুরস্কার
- সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার (১৯৫৯): ‘বক বধপালা’ নাটকের জন্য।
- রবীন্দ্র পুরস্কার: ‘আর কোনখানে’ আত্মজীবনীর জন্য (১৯৬৯)।
- বিদ্যাসাগর পুরস্কার
- দেশিকোত্তম ও ডি-লিট সম্মাননা
- ভুবনেশ্বরী পদক ও ভুবনমোহিনী দাসী সুবর্ণ পদক।
লীলা মজুমদারের সৃজনশীলতা এবং সহজ-সরল ভাষায় গল্প বলার ক্ষমতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক অমর ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
