
মহাশ্বেতা দেবী (১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ – ২৮ জুলাই ২০১৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিকই নন, একই সঙ্গে ছিলেন মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবী। সাহিত্যকে তিনি শিল্পের সীমা ছাড়িয়ে নিপীড়িত, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
পরিবার ও মানসগঠন
মহাশ্বেতা দেবীর শৈশব ও মানসিক বিকাশ গড়ে উঠেছিল গভীর সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিবেশে। তাঁর পিতা মনীষ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি ও সাহিত্যিক এবং মাতা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন কবি ও সমাজমনস্ক মানুষ। পিতা-মাতার নয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পরিবারের সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতিবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তাঁর চিন্তা ও লেখনীর ভিত গড়ে দেয়। তাঁর কাকা ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক—যাঁর শিল্পদৃষ্টিও পরোক্ষভাবে মহাশ্বেতা দেবীর মননজগতে প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ
ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা তাঁকে পাশ্চাত্য সাহিত্যচিন্তার সঙ্গে পরিচিত করে তোলে। তবে শিক্ষা-জীবনে নানা সামাজিক ও ঐতিহাসিক অভিঘাতের কারণে তাঁর একাডেমিক পথ ছিল সহজ নয়। দীর্ঘ বিরতির পরও তিনি অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ করেন—যা তাঁর দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা
তিনি কলকাতার বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। পরবর্তীকালে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিজেকে পুরোপুরি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার কাজে নিয়োজিত করেন। তাঁর রচিত শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে ‘হাজার চুরাশির মা’, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘নৈঋতে মেঘ’, ‘অগ্নিগর্ভ’, ‘চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর’, ‘শালগিরির ডাকে’ প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখায় ইতিহাস, সমাজ ও মানুষের জীবনসংগ্রাম একসূত্রে মিলিত হয়েছে।
ইতিহাসাশ্রয়ী সাহিত্য ✨
ইতিহাসভিত্তিক জীবনীগ্রন্থ ‘ঝাঁসির রানি’ তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবে দৃঢ় অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ধারায় তিনি আরও রচনা করেন ‘আঁধার মানিক’, ‘তিতুমীর’, ‘কৈবর্ত খা’ প্রভৃতি উপন্যাস। এখানে রাজশক্তির কাহিনির বদলে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবন, লোককথা ও লোকসংগ্রাম।
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও গল্প 📚
- হাজার চুরাশির মা
- অরণ্যের অধিকার
- নৈঋতে মেঘ
- অগ্নিগর্ভ
- চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর
- শালগিরির ডাকে
- আঁধার মানিক
- তিতুমীর
- কৈবর্ত খা
- ঝাঁসির রানি
ছোটগল্পেও তিনি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা নির্মাণ করেছেন অসামান্য দক্ষতায়। ‘দ্রৌপদী’, ‘শিকার’, ‘শিশু’, ‘লাইফার মাছ’, ‘বিছন’ প্রভৃতি গল্পে সমাজের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সমাজচেতনা ও আদিবাসী আন্দোলন
মহাশ্বেতা দেবী আজীবন মানবতাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কলেজজীবনে কমিউনিজমের প্রতি আগ্রহ জন্মালেও তিনি কখনো দলীয় রাজনীতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করেননি। তিনি বিশেষভাবে পরিচিত আদিবাসী সমাজ ও নারীদের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার জন্য। আদিবাসী জীবনের ভাষ্যকার হিসেবে তিনি অসংখ্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ‘আদিম জাতি ঐক্য পরিষদ’, ‘পশ্চিমবঙ্গের আটত্রিশ গোষ্ঠী’সহ বিভিন্ন আদিবাসী মিলনমঞ্চ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম।
আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও অনুবাদ
তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিভিন্ন ভারতীয় ও বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্য অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। পেশাগত কারণে কিছু বাণিজ্যিক রচনা করলেও, তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন মূলত ভারতবর্ষের ব্রাত্য ও আদিবাসী মানুষের জীবনসংগ্রামের বিশ্বস্ত ভাষ্যকার হিসেবে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি 🏆
- সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার
- পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার
- র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার
- সার্ক সাহিত্য পুরস্কার
উপসংহার
মহাশ্বেতা দেবী বাংলা সাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন—যেখানে সাহিত্য কেবল সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়, বরং নিপীড়িত মানুষের অলিখিত ইতিহাসের দলিল। তাঁর কলম ছিল প্রতিবাদী, মানবিক ও নির্ভীক। সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ এই সাহিত্যিকের অবদান বাংলা সাহিত্য ও ভারতীয় সামাজিক চেতনার ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
