
আশাপূর্ণা দেবী (৮ জানুয়ারি ১৯০৯ – ১২ জুলাই ১৯৯৫) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা—যিনি প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থেকেও গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তির মাধ্যমে সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ, বিশেষত নারীর জীবন, মানসিক টানাপোড়েন ও অন্তর্লোকের অনুভব তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। সাধারণ গৃহবধূর জীবন যাপন করেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখিকা হিসেবে।
পারিবারিক পরিবেশ ও শৈশব
উত্তর কলকাতার এক যৌথ পরিবারে বড় হওয়া আশাপূর্ণা দেবীর শৈশব গড়ে উঠেছিল সাহিত্যপ্রবণ পরিবেশে। পিতা ছিলেন একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট এবং মাতা ছিলেন একনিষ্ঠ সাহিত্যপাঠিকা। বাড়িতে নিয়মিত আসত অসংখ্য পত্রিকা ও সাহিত্যগ্রন্থ, যা তাঁর মানসিক বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। ঠাকুরমার কঠোর অনুশাসনে প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পেলেও, পারিবারিক পাঠাভ্যাসই হয়ে ওঠে তাঁর প্রকৃত বিদ্যালয়।
শিক্ষা ও আত্মগঠন
বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনো সম্ভব না হলেও আশাপূর্ণা দেবী নিজ প্রচেষ্টায় পড়া ও লেখায় দক্ষতা অর্জন করেন। অল্প বয়সেই দাদাদের পড়া শুনে শুনে তিনি পড়তে শেখেন এবং বই হয়ে ওঠে তাঁর নিত্যসঙ্গী। বাংলা ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেও তিনি যে সাহিত্যভুবন নির্মাণ করেন, তা প্রমাণ করে—সৃষ্টিশীলতার জন্য প্রথাগত শিক্ষাই একমাত্র শর্ত নয়।
ব্যক্তিত্ব ও মানসিক জগৎ ✨
ছেলেবেলায় তিনি ছিলেন প্রাণচঞ্চল ও সাহসী। খেলাধুলা, দুঃসাহসিক কাজ এবং কৌতূহল—সবকিছুতেই ছিল তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন কর্তব্যনিষ্ঠ কন্যা ও গৃহবধূ, কিন্তু সেই ঘরোয়া জীবনের আড়ালেই গড়ে উঠেছিল এক গভীর চিন্তাশীল লেখকসত্তা। নারীর অন্তর্গত শক্তি, নীরব প্রতিবাদ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে।
সাহিত্যজীবন ও সৃষ্টিকর্ম
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্যজীবন ছিল বিস্ময়করভাবে সমৃদ্ধ। তিনি রচনা করেছেন বিপুলসংখ্যক উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্য। তাঁর লেখার প্রধান শক্তি ছিল বাস্তব জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। তিনি উচ্চকিত বিপ্লব নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নীরব প্রতিবাদকে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসত্রয়ী— যা বাঙালি নারীর সামাজিক অবস্থান ও বিবর্তনের এক শক্তিশালী দলিল:
- প্রথম প্রতিশ্রুতি
- সুবর্ণলতা
- বকুলকথা
পুরস্কার ও স্বীকৃতি 🏆
বাংলা ও ভারতীয় সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য আশাপূর্ণা দেবী লাভ করেছেন বহু সম্মান। তাঁর প্রাপ্ত কিছু উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি হলো:
- দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার
- সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপ
- পদ্মশ্রী সহ একাধিক রাষ্ট্রীয় সম্মান
- পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান রবীন্দ্র পুরস্কার
- বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি
উত্তরাধিকার
আশাপূর্ণা দেবীর সাহিত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজ বদলেছে, সময় এগিয়েছে—তবু তাঁর লেখায় উঠে আসা নারীর প্রশ্ন, আত্মসম্মান ও অস্তিত্বের লড়াই আজও পাঠককে ভাবায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন সেই লেখিকা হিসেবে, যিনি ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই নির্মাণ করেছিলেন এক বিস্তৃত সাহিত্যজগৎ।
