Bangla Panjika 2026

রাহুল দেব বর্মণ: ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

রাহুল দেববর্মণ (২৭ জুন ১৯৩৯ – ৪ জানুয়ারি ১৯৯৪) ছিলেন ভারতের সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক ছিলেন। ভক্ত ও অনুরাগী মহলে তিনি ‘পঞ্চম’ বা ‘পঞ্চম দা’ এবং ‘আর. ডি. বর্মণ’ নামেই বেশি পরিচিত। ভারতীয় সিনেমার সঙ্গীত জগতে তাঁকে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কিংবদন্তি গায়ক কিশোর কুমার এবং প্রখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকরআশা ভোঁসলেকে দিয়ে তিনি অসংখ্য কালজয়ী জনপ্রিয় গান তৈরি করেছিলেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতা এবং নতুনত্বের প্রচেষ্টা তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের সুরকারদের কাছে এক বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে স্থাপিত করেছে।

প্রারম্ভিক জীবন ও ‘পঞ্চম’ নামের নেপথ্যে

রাহুল দেববর্মণের জন্ম কলকাতায়। তাঁর বাবা ছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ শচীন দেববর্মণ এবং মা ছিলেন গীতিকার মীরা দাসগুপ্ত। শৈশবে দিদিমা তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন ‘টুবলু’। তবে পরবর্তীতে ‘পঞ্চম’ নামটিই তাঁর পরিচয় হয়ে ওঠে।

‘পঞ্চম’ নামের রহস্য ✨

এই ‘পঞ্চম’ নামের পেছনে নানা গল্প প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, ছোটবেলায় তিনি যখন কাঁদতেন, তাঁর কান্নায় সা-রে-গা-মা-পা-এর ‘পা’ ধ্বনি অর্থাৎ পঞ্চম সুরের আভাস পাওয়া যেত, তাই তাঁর নাম হয় পঞ্চম। আবার অনেকের মতে, বিখ্যাত অভিনেতা অশোক কুমার তাঁর এই ডাকনামটি রেখেছিলেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় কলকাতাতেই।

সঙ্গীতে হাতেখড়ি ও প্রশিক্ষণ

সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠা রাহুলের প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ পায়। মাত্র নয় বছর বয়সেই তিনি ‘অ্যায় মেরি টোপি পলট কে আ’ গানটির সুর করেছিলেন, যা পরে তাঁর বাবা শচীন কর্তা ‘ফানটুশ’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। কালজয়ী গান ‘সর জো তেরা চকরায়ে’-এর সুরও তাঁরই করা, যা ‘পিয়াসা’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল।

তিনি মুম্বাইতে ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং সমতা প্রসাদের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন। এছাড়াও সঙ্গীতকার সলিল চৌধুরীর কাছে তিনি সঙ্গীতের অনেক খুঁটিনাটি শিখেছিলেন। দীর্ঘ সময় তিনি বাবা শচীন দেববর্মণের সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন সঙ্গীতানুষ্ঠানে হারমোনিয়াম বাজাতেন। বাবার সহকারী হিসেবে ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘কাগজ কে ফুল’, ‘বন্দিনী’, ‘গাইড’-এর মতো বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রে কাজ করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। জনপ্রিয় গান ‘হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা’-তে বিখ্যাত মাউথ অর্গানের অংশটি তিনিই বাজিয়েছিলেন।

কর্মজীবন ও অবিস্মরণীয় অবদান

একজন স্বাধীন সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল ‘ছোটে নবাব’। তবে তাঁর জীবনের প্রথম তুমুল জনপ্রিয় বা হিট চলচ্চিত্র ছিল ‘তিসরি মঞ্জিল’। এই ছবির গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরত। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে তিনশতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। চলচ্চিত্রের বাইরেও পুজোর সময় তাঁর সুরে এবং গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় অনেক জনপ্রিয় বাংলা গানের অ্যালবাম প্রকাশিত হতো।

রাহুল দেববর্মণ ছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের একজন প্রকৃত পথপ্রদর্শক। তিনি প্রথাগত সঙ্গীতের বাইরে গিয়ে সবসময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করতেন। নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, নতুন ঘরানার সঙ্গীত, নতুন কণ্ঠ এবং ছন্দ-তালের অকল্পনীয় মিশ্রণে তিনি এক পৃথক স্বর্ণযুগের রচনা করেছিলেন। তাঁর সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল আজও অমর হয়ে আছে।

ব্যক্তিগত জীবন ও সঙ্গীতের ওপর প্রভাব

রাহুল দেববর্মণের ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই তাঁর সঙ্গীতেও প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন রীতা প্যাটেল, যার সাথে দার্জিলিংয়ে তাঁর পরিচয় হয়। জীবনের এক পর্যায়ে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়, যা রাহুলকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। শোনা যায়, এই বিচ্ছেদের পরেই তিনি ‘পরিচয়’ চলচ্চিত্রের বিখ্যাত ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারো’ গানটির সুর করেছিলেন, যা দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল।

পরবর্তীতে তিনি প্রখ্যাত গায়িকা আশা ভোঁসলেকে বিবাহ করেন। আশা ভোঁসলে তাঁকে নিজের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে মনে করতেন এবং আজীবন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেছেন।

কিছু অজানা গল্প ও অনন্য সৃষ্টিশীলতা ✨

সঙ্গীত নিয়ে তাঁর পাগলামি এবং নতুন কিছু করার নেশা ছিল অতুলনীয়। ‘খুশবু’ সিনেমার জনপ্রিয় গান “ও মাঝি রে”-এর রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি এক অদ্ভুত কান্ড করেছিলেন। গানের মিউজিকের একটি বিশেষ শব্দ তৈরির জন্য তিনি তাঁর সহকারীকে সোডার বোতলে ফুঁ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা গানে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল।

আরেকটি ঘটনা তাঁর শেষ জীবনের অন্যতম সেরা কাজ ‘১৯৪২: আ লভ স্টোরি’ চলচ্চিত্র নিয়ে। গায়ক কুমার শানু যখন ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লগা’ গানটি রেকর্ড করছিলেন, তখন একটি টেক খুব পছন্দ হওয়ায় রাহুল আবেগাপ্লুত হয়ে শানুকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করেন এবং অদ্ভুতভাবে গালিগালাজ শুরু করেন। প্রথমে অবাক হলেও, পরে শানু জানতে পারেন যে গানের রেকর্ডিং খুব পছন্দ হলেই পঞ্চম দা এভাবেই তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করতেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা 🏆

সঙ্গীত জীবনে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তিনি তাঁর কর্মজীবনে মোট তিনবার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সম্মানজনক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর সুর করা শেষ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হন।

উপসংহার

রাহুল দেববর্মণ শুধু একজন সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক যুগের স্রষ্টা। তাঁর সুর আজও শ্রোতাদের মনে দোলা দেয়, নতুন প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সময়ের সীমানা পেরিয়ে তাঁর সঙ্গীত আজও চিরনবীন।

home3