
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে রাজেশ খান্না এক অনন্য নাম (২৯ ডিসেম্বর ১৯৪২ – ১৮ জুলাই ২০১২) —একটি সম্পূর্ণ যুগের প্রতীক। তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতাই নন, বরং বলিউডে ‘সুপারস্টার’ সংস্কৃতির সূচনাকারী। অভিনয়ের সহজাত আবেগ, সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা এবং পর্দায় তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দর্শকের মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল, যা আজও অম্লান। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনীতিবিদ হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষাজীবন
শৈশবে তাঁর নাম ছিল যতীন অরোরা। পরবর্তীকালে চুন্নি লাল খান্না ও লীলাবতী খান্নার কাছে দত্তক গৃহীত হয়ে তাঁর নাম হয় যতীন খান্না। মুম্বইয়ের গিরগাঁও এলাকার ঠাকুরদোয়ারের কাছে সরস্বতী নিবাসে তাঁর বেড়ে ওঠা। শিক্ষাজীবনে তিনি সেন্ট সেবাস্টিয়ান’স গোয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন, যেখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভবিষ্যতের জনপ্রিয় অভিনেতা জিতেন্দ্র। এরপর হিল গ্র্যাঞ্জ হাইস্কুল এবং কিষিনচাঁদ চেলারাম কলেজে তাঁর পড়াশোনা চলে।
ছাত্রজীবন থেকেই থিয়েটার ও মঞ্চনাটকের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। স্কুল ও কলেজের বিভিন্ন নাটক ও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি একাধিক পুরস্কার অর্জন করেন। এই মঞ্চানুভবই তাঁর অভিনয়শৈলীর ভিত গড়ে দেয়। চলচ্চিত্রে প্রবেশের সময় নিজের নাম পরিবর্তন করে তিনি গ্রহণ করেন “রাজেশ খান্না”—যে নাম অচিরেই কোটি দর্শকের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠে।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে Rajesh Khanna ছিলেন আলোচিত ও বহুমাত্রিক। ফ্যাশন ডিজাইনার ও অভিনেত্রী অঞ্জু মাহেন্দ্রুর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীকালে অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে দুই কন্যা—টুইঙ্কল খান্না ও রিঙ্কি খান্না। দাম্পত্য জীবনে নানা টানাপোড়েন থাকলেও পারস্পরিক সৌজন্য ও যোগাযোগ বজায় ছিল। টুইঙ্কল খান্না পরবর্তীকালে জনপ্রিয় অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রিঙ্কি খান্না চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে এসে ব্যক্তিগত জীবনে মনোনিবেশ করেন।
অভিনয় জীবন
রাজেশ খান্না তাঁর অভিনয়জীবনে প্রায় ১৬৩টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার অধিকাংশেই তিনি মুখ্য চরিত্রে ছিলেন। আখরী খাত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ। এরপর একে একে আরাধনা, আনন্দ, কাটি পতঙ্গ, সফর, সাচা ঝুটা, রাজা রাণী, বাওয়ারর্চি, অমর প্রেম—এর মতো অসংখ্য স্মরণীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের সমান প্রশংসা অর্জন করেন। টানা বহু ব্যবসাসফল ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি এমন এক রেকর্ড গড়ে তোলেন, যা বলিউড ইতিহাসে আজও বিরল। এক সময় তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেন।
আরাধনা : এক মাইলফলক ✨
শক্তি সামন্ত পরিচালিত আরাধনা রাজেশ খান্নার অভিনয়জীবনে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই ছবির মাধ্যমেই তিনি বলিউডে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং ‘সুপারস্টার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। শর্মিলা ঠাকুরের বিপরীতে দ্বৈত চরিত্রে তাঁর সংবেদনশীল অভিনয়, আবেগঘন সংলাপ ও গান দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও লাভ করে এবং বছরের সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করে। আরাধনা-র সাফল্যের পর থেকেই রাজেশ খান্নার জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে এবং তাঁর প্রতি দর্শকের উন্মাদনা বলিউডে এক নতুন ধারা তৈরি করে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
রাজেশ খান্না একাধিকবার ফিল্মফেয়ার ও বিএফজেএ সেরা অভিনেতা পুরস্কারে মনোনীত হন এবং সম্মান লাভ করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিশেষ সম্মাননা ও আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হন। এসব পুরস্কার তাঁর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অভিনয় দক্ষতারও স্বীকৃতি বহন করে।
রাজনৈতিক জীবন
চলচ্চিত্র জগতের বাইরে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে লোকসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন। সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি নতুন চলচ্চিত্রে অভিনয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন। পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এলেও দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় তাঁকে।
উত্তরাধিকার
রাজেশ খান্না কেবল একজন অভিনেতা নন—তিনি ছিলেন এক সময়ের আবেগ, উন্মাদনা ও স্বপ্নের নাম। প্রেক্ষাগৃহে তাঁর ছবির পোস্টারে মালা দেওয়া, সংলাপ মুখস্থ করে বলা কিংবা তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য ভিড়—সবই তাঁর জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য। আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রে ‘সুপারস্টার’ শব্দটি উচ্চারিত হলে রাজেশ খান্নার নাম স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে।
