Bangla Panjika 2026

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো: আধুনিক ভারতের যুক্তিবাদী চেতনার অগ্রদূত

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো ( ১৮ এপ্রিল, ১৮০৯ – ২৬ ডিসেম্বর, ১৮৩১) বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও বিস্ময়কর নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একাধারে একজন ইউরেশীয় কবি, নির্ভীক যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ এবং একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। খুব অল্প সময়ের জীবন পেলেও তিনি ভারতীয় যুবসমাজের মধ্যে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের বীজ বপন করেছিলেন, তা আজও অম্লান। তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা আজও বাংলার মুক্তচিন্তার পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃত।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

কলকাতার এন্টালি-পদ্মপুকুর অঞ্চলে এক ইন্দো-পর্তুগিজ পরিবারে ডিরোজিয়োর জন্ম। তাঁর পিতা ফ্রান্সিস ডিরোজিয়ো ছিলেন একজন খ্রিস্টান ইন্দো-পর্তুগিজ অফিস কর্মী এবং মাতা সোফিয়া জনসন ডিরোজিয়ো ছিলেন একজন ইংরেজ মহিলা। ডিরোজিয়ো ডেভিড ড্রুমন্ডের ধর্মতলা অ্যাকাডেমি স্কুল থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। ড্রুমন্ডের উদার ও যুক্তিবাদী শিক্ষা ডিরোজিয়োর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তাঁকে পরবর্তী জীবনে একজন বলিষ্ঠ মুক্তচিন্তক হিসেবে গড়ে তোলে।

হিন্দু কলেজ ও শিক্ষকতা জীবন

মাত্র সতেরো বছর বয়সে ডিরোজিয়ো কলকাতার হিন্দু কলেজের ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি ছিল প্রথাগত শিক্ষার ঊর্ধ্বে। শিক্ষার্থীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছাত্রদের সাথে কলেজ প্রাঙ্গণের বাইরেও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন এবং বিজ্ঞান নিয়ে গভীর আলোচনা করতেন। তাঁর এই অসামান্য ব্যক্তিত্ব ছাত্রদের মধ্যে নতুন এক চেতনার সঞ্চার করেছিল।

অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন ✨

১৮২৮ সালে তিনি তাঁর ছাত্রদের নিয়ে অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি বিতর্ক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। মানিকতলার এক বাগান বাড়িতে এর সভাগুলি অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে সামাজিক কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তরুণরা নির্ভয়ে যুক্তি প্রদর্শন করত।

ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন

ডিরোজিয়োর নির্দেশনায় হিন্দু কলেজের ছাত্রদের মধ্যে যে বৈপ্লবিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়, তাঁরা ‘ইয়ং বেঙ্গল’ (Young Bengal) বা ‘ডিরোজিয়ান’ নামে পরিচিত হন। তিনি তাঁদেরকে মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন করা এবং কোনো কিছু অন্ধভাবে গ্রহণ না-করতে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁর এই শিক্ষা বাংলার সমাজব্যবস্থায় এক বৌদ্ধিক বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ হয়েছিল। তাঁরা নারী অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সামাজিক সাম্যের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।

সাহিত্য সাধনা ও সাংবাদিকতা

ডিরোজিয়োকে আধুনিক ভারতের অন্যতম প্রথম ‘জাতীয়’ কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি নিজেকে সর্বদা ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। তিনি ‘দ্য ইস্ট ইন্ডিয়ান’ নামক ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এবং তাঁর অনুগামীদের সাংবাদিকতা পেশায় উদ্বুদ্ধ করতেন। দেশাত্মবোধ ও যুক্তিবাদ ছিল তাঁর কাব্যচর্চার মূল ভিত্তি।

গুরুত্বপূর্ণ রচনাসমূহ 📚

  • টু ইন্ডিয়া – মাই নেটিভ ল্যান্ড
  • দ্য ফকির অব জঙ্গীরা
  • দ্য হার্প অব ইন্ডিয়া
  • টু দ্য পিউপিলস অব দ্য হিন্দু কলেজ
  • পোয়েমস (১৮২৭)
  • সং অব দ্য হিন্দুস্থানি মিন্সট্রেল

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলায় ডিরোজিয়োকে হিন্দু কলেজের পদ থেকে বরখাস্ত করা হলেও তাঁর আদর্শ দমে যায়নি। তিনি তাঁর ছাত্রদের মনে সংস্কারমুক্তির যে চেতনা উদ্দীপ্ত করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর তাঁর প্রভাব আজও স্থায়ী। আজও মুক্তচিন্তা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাসে ডিরোজিয়োর নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

home3