
হিন্দু ধর্মে তুলসী গাছকে অত্যন্ত পবিত্র বলে মানা হয়। প্রতিদিন পূজিতা হন দেবী তুলসী। অনেকেই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালান, জল দেন এবং শাঁখ বাজান। বিশ্বাস করা হয়, তুলসী দেবী আসলে লক্ষ্মীর অবতার এবং বৃন্দা রূপে তাঁর জন্ম। তাই তুলসী ঘরের সমৃদ্ধি, শান্তি ও পবিত্রতার প্রতীক।
তুলসী শুধু দেবী নন—তিনি এক মহৌষধিও। ঠান্ডা–কাশি থেকে মানসিক শান্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা—বহু গুণে সমৃদ্ধ তুলসী ভারতীয় আয়ুর্বেদের প্রধান স্থান দখল করে আছে।
⭐ বৃন্দা ও জলন্ধরের পৌরাণিক কাহিনি
অতীতকালের কথা—অসুরবংশে জন্ম হয়েছিল এক শুভ্র চরিত্রের, সতী ও ধর্মপরায়ণা নারীর। তাঁর নাম বৃন্দা। জন্মসূত্রে তিনি রাক্ষসকন্যা হলেও হৃদয়ে ছিলেন একনিষ্ঠ বিষ্ণুভক্তা। তাঁর স্বামী জলন্ধর, দীক্ষিত যোদ্ধা ও অসামান্য শক্তির অধিকারী একজন রাক্ষসরাজ।
বৃন্দার সতীত্ব ও পবিত্রতার শক্তিতে জলন্ধর হয়ে উঠেছিলেন অজেয়। তাঁর বিপুল শক্তির সামনে স্বর্গের দেবতারা ক্রমেই পরাস্ত হচ্ছিলেন। যে যুদ্ধে দেবতারা পরাজয় নিতেই বাধ্য হয়েছেন বারবার, তার পেছনে ছিল বৃন্দার সেই অনন্য সতীত্বশক্তি।
দেবতারা শেষমেশ শরণাপন্ন হলেন ভগবান বিষ্ণুর কাছে।
জলন্ধরকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় ছিল—বৃন্দার সতীত্ব ভঙ্গ করা। কিন্তু সৎ ও ভক্তের প্রতি দয়ালু বিষ্ণুর কাছে এটি ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত।
তবুও সৃষ্টির ভারসাম্য ও দেবতাদের মুক্তির জন্য তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করেন—
জলন্ধরের রূপে বৃন্দার সামনে উপস্থিত হন।
বৃন্দা তাঁর স্বামীর রূপ দেখে বিভ্রান্ত হন, এবং সেই মুহূর্তেই তাঁর সতীত্ব ভঙ্গ হয়।
ঠিক সেই ক্ষণেই জলন্ধরের অজেয় শক্তি লোপ পায়।
শিব পরবর্তীতে যুদ্ধে জলন্ধরকে বধ করেন।
গভীর ধ্যানের পর, সত্য উদ্ঘাটিত হলে বৃন্দা বুঝতে পারেন—যে ব্যক্তি তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি তাঁর স্বামী নন, স্বয়ং নারায়ণ।
বেদনার্ত বৃন্দা তখন বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন, আর সেই অভিশাপের ফলেই তিনি পরিণত হন শালগ্রাম শিলাতে।
বৃন্দা পরে নিজের দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর দেহের ভস্ম থেকে জন্ম নেয় একটি গাছ—
সেই পবিত্র গাছই আজকের তুলসী, যাকে দেবী লক্ষ্মীর রূপে পূজা করা হয়।
⭐ তুলসী পূজন দিবসের তাৎপর্য
প্রতি বছর ২৫শে ডিসেম্বর এই বিশেষ দিবসটি পালিত হয়।
উদ্দেশ্য: তুলসী গাছের আধ্যাত্মিক শক্তি, ঔষধি গুণ এবং দেবী তুলসীর পবিত্রতাকে সম্মান জানানোই এই দিনের মূল উদ্দেশ্য। ভক্তি, ইতিবাচক শক্তি, সুস্থতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রাখার বার্তা বহন করে এই পূজা।
আচার:
এই দিনে—
- তুলসী গাছ রোপণ করা,
- তুলসীর মঞ্চ পরিষ্কার করা,
- প্রদীপ জ্বালানো,
- ধূপ–ফুল নিবেদন,
- পরিবারসহ প্রার্থনা—
এসবকে অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়। তুলসীর নিচে প্রদীপ জ্বালানো স্বাস্থ্য, শক্তি, শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক বলে মানা হয়।
সংক্ষেপে: তুলসী পূজন দিবস হলো দেবী তুলসীর সম্মানে পালিত এক পবিত্র উৎসব, যা পৌরাণিক কাহিনি, ভক্তি, সুস্থতা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রায় প্রতিটি সনাতনী পরিবারের ঘরেই এই দিনের মাহাত্ম্য পালন করা হয়।
