Bangla Panjika 2026

শ্রীনিবাস রামানুজন: প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই গণিত বিশ্বকে চমকে দেওয়া এক বিস্ময়

শ্রীনিবাস রামানুজন ছিলেন ভারতের এক অসামান্য গণিতপ্রতিভা, যাঁর চিন্তা ও আবিষ্কার আধুনিক গণিতকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে। প্রথাগত শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় সংখ্যাতত্ত্ব, গাণিতিক বিশ্লেষণ, অসীম ধারা ও অবিচ্ছিন্ন ভগ্নাংশের মতো জটিল শাখায় যুগান্তকারী কাজ করে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া নোটখাতাগুলি পরবর্তী প্রজন্মের গণিতবিদদের কাছে আজও অমূল্য সম্পদ।

জন্ম ও শৈশবের পরিবেশ

অবিভক্ত ভারতের মাদ্রাজের এক দরিদ্র কিন্তু ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ পরিবারে রামানুজনের জন্ম। তাঁর শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্য দিয়ে। তাঁর পিতা ছিলেন একটি কাপড়ের দোকানের সামান্য একজন হিসাবরক্ষক এবং মা ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন গৃহিণী। কথিত আছে, তাঁর মায়ের গভীর ঈশ্বরভক্তির ফলস্বরূপ রামানুজনের জন্ম হয়েছিল, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর চিন্তা ও দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

গণিতের প্রতি সহজাত মেধা

মাত্র ১০ বছর বয়সেই রামানুজন গণিতের প্রকৃত রহস্যের সঙ্গে পরিচিত হন। কোনো শিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই তিনি এস এল লোনির লেখা ‘ত্রিকোণমিতি’ বইটি আয়ত্ত করে ফেলেন। ১২ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি জটিল গাণিতিক উপপাদ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং নিজে নতুন উপপাদ্য আবিষ্কার করেন। স্কুলের ধরাবাঁধা শিক্ষার চেয়ে তিনি গণিতের নিজস্ব জগতেই বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করতেন।

জীবন সংগ্রাম ও অদম্য জেদ

১৭ বছর বয়সে রামানুজন বার্নোলির সংখ্যা ও অয়েলার-মাসেরনি ধ্রুবকের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সম্পন্ন করেন। কিন্তু গণিতের প্রতি তাঁর গভীর একাগ্রতা অন্যান্য একাডেমিক বিষয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কুম্বাকোটম সরকারি কলেজে পড়ার জন্য বৃত্তি পেলেও অ-গাণিতিক বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় তাঁর বৃত্তি বাতিল হয়ে যায়। তবুও তিনি দমে যাননি। জীবন ধারণের জন্য তিনি মাদ্রাজ বন্দর ট্রাস্টের হিসাবরক্ষকের কার্যালয়ে সামান্য এক কেরানি পদে যোগ দেন, কিন্তু তাঁর গাণিতিক গবেষণা একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি।

জি. এইচ. হার্ডি ও কেমব্রিজ যাত্রা ✨

রামানুজনের মেধা বিশ্ববাসীর নজরে আসে যখন তিনি কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতবিদ জি. এইচ. হার্ডির সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। তাঁর পাঠানো ১২০টি উপপাদ্য দেখে হার্ডি বুঝতে পারেন যে, রামানুজন সাধারণ কোনো মেধাবী নন, বরং তিনি একজন জন্মগত প্রতিভা। তাঁর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে পরবর্তীতে রামানুজন ইংল্যান্ড যাত্রা করেন এবং ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন।

গণিতশাস্ত্রে অবস্মরণীয় অবদান

রামানুজন গণিতের বিভিন্ন শাখায়, বিশেষ করে গাণিতিক বিশ্লেষণ, সংখ্যাতত্ত্ব, অসীম ধারা ও আবৃত্ত ভগ্নাংশ শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

  • পাই (π)-এর মান: তিনি পাই-এর এমন কিছু নির্ভুল ধারা উদ্ভাবন করেন যা বর্তমানে কম্পিউটার অ্যালগরিদমের ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
  • রামানুজনের নোটবুক: তাঁর ডায়েরি বা নোটবুক থেকে পরবর্তীতে গণিতের বহু নতুন সমাধান পাওয়া গেছে।
  • ১৭২৯ সংখ্যা: এটি ‘হার্ডি-রামানুজন সংখ্যা’ নামে পরিচিত। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে এটিই ক্ষুদ্রতম সংখ্যা যাকে দুটি ভিন্ন উপায়ে দুটি ঘনফলের সমষ্টিরূপে প্রকাশ করা যায়।

সংস্কৃতিতে ও শেষ জীবন

রামানুজন ছিলেন একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। তাঁর মতে, “কোনো গাণিতিক সূত্র যদি ঈশ্বরের চিন্তা প্রকাশ না করে, তবে তার কোনো গুরুত্ব নেই।” বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশ এবং অসুস্থতার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে। অবশেষে ভারতে ফিরে আসার কিছুকাল পর যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান প্রতিভার মহাপ্রয়াণ ঘটে।

বর্তমানে পপ কালচারেও তাঁর জীবন এক বড় অনুপ্রেরণা। হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘গুড উইল হান্টিং’ এবং তাঁর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’-তে তাঁর সংগ্রামের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

উপসংহার

শ্রীনিবাস রামানুজন কোনো সাধারণ গণিতবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের এক উজ্জ্বল রত্ন। প্রথাগত শিক্ষার অভাব থাকলেও শুধুমাত্র একাগ্রতা আর মেধা দিয়ে তিনি যেভাবে বিশ্ব গণিতের ইতিহাস বদলে দিয়েছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

home3