Bangla Panjika 2026

বিপ্লবী বিনয় কৃষ্ণ বসু: অগ্নিযুগের এক দুর্ধর্ষ বিপ্লবী

বিনয় কৃষ্ণ বসু (১১ সেপ্টেম্বর ১৯০৮ – ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩০), যিনি বিনয় বসু নামে পরিচিত, ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগের এক উজ্জ্বল বাঙালি বিপ্লবী। তাঁর সাহস, নির্ভীকতা ও দেশমাতৃকার প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাঁকে বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

প্রাথমিক জীবন

অবিভক্ত বাংলার বিক্রমপুর অঞ্চলের এক শিক্ষিত পরিবারে বিনয় বসুর শৈশব কাটে। পিতা ছিলেন পেশায় প্রকৌশলী, যার প্রভাবে ছোটবেলায় থেকেই শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। ঢাকায় ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন এবং চিকিৎসা শিক্ষার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেন।

কিন্তু ছাত্রজীবনেই তিনি হেমচন্দ্র ঘোষের মতো বিপ্লবী নেতার সংস্পর্শে আসেন। মুক্তি সঙ্ঘ ও যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ক্রমেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ এতটাই বেড়ে যায় যে চিকিৎসাশিক্ষা শেষ করা আর সম্ভব হয়নি। দেশপ্রেমই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের একমাত্র পথ।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ড

দেশব্যাপী বিক্ষোভ, আন্দোলন চলার সময় বিনয় যোগ দেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর গঠিত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সংগঠনের ঢাকা শাখা গড়ে তোলেন এবং রাজবন্দীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব হন।

পরবর্তীতে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে তিনি ব্রিটিশ পুলিশের কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে টার্গেট করেন। সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে হাসপাতালের নিরাপত্তা বৃত্ত ভেঙে তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে লোম্যানকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় পুলিশ হডসনও স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।

ঘটনার পর পুলিশের নজর এড়িয়ে তিনি কলকাতায় আশ্রয় নেন। পুলিশ তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। নানা ছদ্মবেশে আত্মগোপন করেও বিপ্লবী লক্ষ্য থেকে তাঁর মনোযোগ এক মুহূর্তও বিচ্যুত হয়নি।

রাইটার্স ভবনে ঐতিহাসিক অভিযান

ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারী কারা ইন্সপেক্টর জেনারেল এন. এস. সিম্পসন ছিলেন বিপ্লবীদের পরবর্তী লক্ষ্য। রাজবন্দীদের ওপর অকথ্য নির্যাতনের জন্য সিম্পসন তাঁদের কাছে অন্যতম শত্রু।

বিনয়, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত মিলে ইউরোপীয় ছদ্মবেশে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন। অপার সাহসের সঙ্গে তারা লক্ষ্যভেদে সফল হন—সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। এই ঘটনায় ব্রিটিশ প্রশাসন থমকে যায়।

গোলাগুলির উত্তাপে পরিস্থিতি তীব্র হয়ে উঠলে তিন বিপ্লবীই শেষ পর্যন্ত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ধরা না পড়ার সংকল্পে বাদল সায়ানাইড সেবন করেন। বিনয় ও দীনেশ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁরা গুরুতর আহত অবস্থায় জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হন।

বিনয় বসুর রসিক উত্তর ✨

সিআইডি কর্মকর্তারা তথ্য আদায়ের চেষ্টা করলেও তিনি দৃঢ় সাহস নিয়ে প্রতিবারই তাঁদের প্রশ্নকে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যেই ফিরিয়ে দেন। পুরস্কার ঘোষণার প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর রসিক উত্তর—

“I have saved your 5,000 rupees and what more you expect from me?”

মৃত্যু ও আত্মত্যাগের স্মৃতি

আহত বিনয়কে দ্রুত কলকাতা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ক্ষতকে বিষাক্ত করে তোলেন, যাতে সুস্থ হয়ে ব্রিটিশদের হাতে তথ্য দিয়ে যেতে না হয়। অসীম সাহসে নিজের যন্ত্রণা অতিক্রম করে তিনি জীবন বিসর্জন দেন, বুকভরা স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে।

বিনয়-বাদল-দীনেশের এই ঐতিহাসিক অভিযানের স্মরণে কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারের নামকরণ হয় বিবাদী বাগ—যা আজও তাঁদের আত্মত্যাগের অমর স্মারক।

home3